ঢাকা

মার্কিন রণতরিতে ৮ সেনার আত্মহত্যার চেষ্টা নিয়ে যা বলল যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এএফপি
ওয়াশিংটন

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সময় আটজন সেনাসদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ তথ্য স্বীকার করেছে।

বিমানবাহী রণতরিটির দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন এবং সেখানে থাকা নাবিকদের জীবনযাপন ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত নৌমন্ত্রী হাং কাও এ তথ্য জানিয়েছেন।

ডেমোক্রেটিক সিনেটর কারস্টেন গিলিব্র্যান্ডের প্রশ্নের জবাবে হাং কাও একটি চিঠি দেন। এএফপির হাতে আসা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে কেন্দ্র করে গঠিত পুরো স্ট্রাইক গ্রুপে মোতায়েনের পর থেকে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।

তবে চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ওই মিশন চলাকালে রণতরিতে আত্মহত্যা করে কোনো সেনাসদস্যের মৃত্যু হয়নি।

আত্মহত্যার চেষ্টার অন্তত দুটি ঘটনার বিবরণও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর একটি ঘটে গত আগস্টের শুরুতে। রণতরির বিমানবহরে দায়িত্ব পালন করা এক নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে যান। পরে দ্রুত অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী একটি হেলিকপ্টার তাঁকে খুঁজে বের করে। চিকিৎসার জন্য তাঁকে রণতরি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

আরেকটি ঘটনা ঘটে গত মার্চে। একজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে থামিয়ে দেন। পরে তাঁকে নিজ ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান এবং সেখানে কর্মরত নাবিকদের জীবনযাপন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ ও আলোচনা চলছিল।

২৮৬ দিন সমুদ্রে

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পরে এর গতিপথ পরিবর্তন করে রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার আগে রণতরিটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। এর পর থেকে রণতরিটি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সামরিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সব মিলিয়ে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে। এই সময়ে রণতরিটি কোথাও বন্দরে ভেড়েনি। চলতি মাসের শুরুতে দীর্ঘ এই সমুদ্রযাত্রার পর রণতরিটি থাইল্যান্ডে গিয়ে থামে।

এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার ফলে রণতরিতে কর্মরত নাবিকদের জীবনযাপন ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গণমাধ্যমে রণতরিতে জীবনযাপনের পরিবেশের অবনতি, মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, খাবারের ঘাটতি ও অপরিচ্ছন্নতার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক অভিযান নিয়েও দেশটির অভ্যন্তরে সমালোচনা চলছিল।

পরিবার ও আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ

গত আগস্টে রণতরিতে কর্মরত সেনাসদস্যদের পরিবারের সদস্য এবং কয়েকজন আইনপ্রণেতা জাহাজটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান, কাজের চাপ এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে তাঁদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়।

আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসার আগে থেকেই রণতরিতে কর্মরত নাবিকদের কল্যাণ নিয়ে উদ্বেগের কথা সামনে এসেছিল। দীর্ঘ মোতায়েনের ফলে তাঁদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ কতটা তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।

তবে রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন অভিযোগ সে সময় নাকচ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রণতরিতে পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও রণতরিটির পরিস্থিতি সম্পর্কে গণমাধ্যমে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, তা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন।

এর মধ্যেই নৌমন্ত্রী হাং কাওয়ের চিঠিতে স্ট্রাইক গ্রুপে আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশ্যে আসায় রণতরিতে কর্মরত সেনাসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে চিঠিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার কোনোটি ওই মিশন চলাকালে রণতরিতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় পরিণত হয়নি। আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাগুলোর মধ্যে যেসব সদস্যের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাঁদের একজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয় এবং অন্যজনকে সহকর্মীরা থামানোর পর নিজ ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ২৮৬ দিনের টানা সমুদ্রযাত্রা এবং এর মধ্যে আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের সময় সেনাসদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনযাপনের পরিবেশ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স