বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। একই সঙ্গে দেশের মেধাবী তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করে ‘ব্রেন ড্রেইন’ বা মেধা পাচারের প্রবণতাকে উল্টো দিকে ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস আয়োজিত ‘ঢাকা চায়না ডে ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে একটি শিক্ষা হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার মান, গবেষণার সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র আরও উন্নত করতে হবে।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান
আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, একসময় মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশে আসত। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে; বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। মালয়েশিয়া কীভাবে নিজেদের শিক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে, বাংলাদেশকে সে অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, মালয়েশিয়ার নেতৃত্ব একদিকে দেশের শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়েছে, অন্যদিকে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগ ও অবকাঠামো তৈরি করেছে। বাংলাদেশকেও বিদেশে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের দেশে ফেরার মতো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে দেশের শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও অর্থনীতির উন্নয়নে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের শুধু ‘ব্রেন ড্রেইন’ হিসেবে দেখলে হবে না; তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার পথ তৈরি করতে হবে। এ জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশে কাজের সুযোগ এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
মানবসম্পদকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো মানবসম্পদ। দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রমকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
বিদেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মেধা ও সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তাঁদের অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে শিল্প খাতের প্রয়োজনের সমন্বয় করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগও বাড়াতে হবে।
চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব
বাংলাদেশের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথা তুলে ধরে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, চীনের উন্নয়ন থেকে বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা নিতে পারে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কম্পিউটার প্রযুক্তি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ তৈরিতে চীনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। এআই ও অন্যান্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসারও জরুরি।
শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ
বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায়।
বাংলাদেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ খাতের উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। চীনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশটির পলিটেকনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে ধরনের সংযোগ রয়েছে, বাংলাদেশেও তেমন শিল্প–শিক্ষা সংযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তা যেন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ বাড়লে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। এতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়াও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তৃতীয় একটি ভাষা শেখানোর বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একাধিক ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চীন আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
শিক্ষাকে জাতির সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে উল্লেখ করে আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
তাঁর মতে, একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বক্তব্য দেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য শামস রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন।