ঢাকা

ট্রাম্পের আমন্ত্রণে জি২০ সম্মেলনে পুতিন, গ্রহণ করবেন কি রুশ প্রেসিডেন্ট

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পলিটিকো
ওয়াশিংটন

ইউরোপের আপত্তির আশঙ্কার মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আগামী ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে অনুষ্ঠেয় জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়ার ওপর চাপ ও বিচ্ছিন্নতা বজায় থাকা অবস্থায় এই আমন্ত্রণ ওয়াশিংটনের মস্কোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার নিউইয়র্কে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, জি২০ সম্মেলন পুতিনের জন্য শুধু ট্রাম্পের সঙ্গে নয়, বিশ্বের অন্যান্য নেতার সঙ্গেও সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি করবে। ওয়াশিংটন আশা করছে, রুশ প্রেসিডেন্ট আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন।

রুবিওর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো কোনো স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে পুতিনকে জি২০-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানোকে ঘিরে ইউক্রেন ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুতিন আসবেন কি না, এখনো অনিশ্চিত

জি২০ সম্মেলনে পুতিন অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। রুবিও আমন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে জানালেও রুশ পক্ষ প্রথমে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। পরে ক্রেমলিন জানিয়েছে, আমন্ত্রণটি তারা বিবেচনা করবে।

পুতিন সম্মেলনে সশরীরে অংশ নিলে ২০১৯ সালের পর এটি হবে জি২০ নেতাদের সম্মেলনে তাঁর প্রথম সরাসরি উপস্থিতি। ২০২৩ সালের জি২০ সম্মেলনে তিনি ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছিলেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে পুতিনের এমন একটি বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক ফোরামে উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে।

ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় এবারের জি২০ সম্মেলনের আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। সম্মেলনটি মায়ামির ট্রাম্প ন্যাশনাল ডোরাল গলফ ক্লাবে হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে পুতিন অংশ নিলে ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্টের মধ্যে আলাদা বৈঠকেরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাশিয়াকে আবার বহুপক্ষীয় আলোচনায় আনতে চান ট্রাম্প

রুবিওর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটন রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে ইউক্রেন সংকট মোকাবিলার একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শুধু যাদের সঙ্গে মতের মিল রয়েছে, তাঁদের সঙ্গেই বৈঠক করলে আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান নাও আসতে পারে। মতবিরোধ রয়েছে বা যাদের সঙ্গে সমস্যা রয়েছে, সমাধানের জন্য তাঁদের সঙ্গেও আলোচনায় বসতে হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের এ অবস্থান ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কূটনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাশিয়ার ওপর চাপ দেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে মস্কোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথও খোলা রাখছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ ধরে রাখতে চাইছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই আমন্ত্রণ

পুতিনকে জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি এসেছে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকার মধ্যেই। বুধবারও কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। রাশিয়ার হামলায় হতাহতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বন্ধের একটি সমঝোতার কথা ট্রাম্প জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও উভয় পক্ষ একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা সীমিত করার জন্য চাপ দিয়েছেন। বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে এসব হামলার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন তিনি।

ফলে জি২০ সম্মেলনে পুতিনের সম্ভাব্য উপস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া অস্থিরতাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

ট্রাম্প–পুতিনের আগের বৈঠক কী ফল দিয়েছিল

পুতিন ও ট্রাম্পের সর্বশেষ মুখোমুখি বৈঠক হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে আলাস্কায়। সেখানে ট্রাম্প রুশ প্রেসিডেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান এবং দুই নেতা ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

তবে সেই বৈঠকের পর ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ওয়াশিংটন অন্য আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও কূটনৈতিক মনোযোগ বাড়িয়েছে।

এবার মায়ামিতে জি২০ সম্মেলনের সময় দুই নেতার আবার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হতে পারে। তবে এ ধরনের বৈঠক থেকে কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার ওপর।

ইউরোপ ও ইউক্রেনের উদ্বেগের জায়গা

পুতিনকে জি২০ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো ইউক্রেন ও ইউরোপের কয়েকটি দেশের জন্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় রুশ প্রেসিডেন্টকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর শীর্ষ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোকে মস্কোর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হতে পারে।

বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি অংশ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখার পক্ষে। তাদের দৃষ্টিতে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও সরাসরি যোগাযোগের পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। রুবিওর বক্তব্যে সেই নীতিই উঠে এসেছে।

জি২০তে রাশিয়ার অবস্থান

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি হলেও রাশিয়া জি২০-এর সদস্যপদ হারায়নি। ফলে পুতিনের জি২০ সম্মেলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নতুন সদস্যপদ বা পুনঃঅন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন নেই।

বরং প্রশ্নটি হচ্ছে—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কতটা সক্রিয়ভাবে জি২০-এর নেতাদের বৈঠকে অংশ নেবেন এবং অন্যান্য নেতার সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা করবেন।

২০১৯ সালের পর পুতিনের সশরীরে অংশগ্রহণ না করার কারণে মায়ামি সম্মেলনে তাঁর উপস্থিতি হলে সেটি জি২০-এর কূটনৈতিক পরিবেশে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।

জি২০ কী

জি২০ বা ‘গ্রুপ অব টোয়েন্টি’ বিশ্বের প্রধান উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি বহুপক্ষীয় ফোরাম। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সমন্বয় ও আলোচনা করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

জি২০ গঠিত ১৯টি দেশ এবং দুটি আঞ্চলিক সংস্থা—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)—নিয়ে। সদস্য দেশগুলো হলো আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

জি২০ সদস্যরা সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশের বেশি এবং বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে এই ফোরামের আলোচনায় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু ঢুকে পড়লেও এর মূল ভিত্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা।

অর্থনীতি থেকে ভূরাজনীতি

প্রতিষ্ঠার সময় জি২০ মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিলেও সময়ের সঙ্গে এর আলোচনার পরিধি বেড়েছে। বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের মতো বিষয় এখন এর আলোচনায় নিয়মিত উঠে আসে।

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে জি২০-এর বৈঠকগুলোতে ভূরাজনৈতিক বিভাজনও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে মায়ামি সম্মেলনে পুতিনের সম্ভাব্য উপস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের আমন্ত্রণ এখন পর্যন্ত পুতিনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে না। ক্রেমলিন আমন্ত্রণটি বিবেচনা করছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট মায়ামিতে গেলে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য প্রধান অর্থনীতির নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় এমন একটি বহুপক্ষীয় মঞ্চে পুতিনের উপস্থিতি রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার একটি সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্কের নতুন গতিপথ, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সমন্বয়—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে সেই প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে মায়ামি সম্মেলনের আগে এবং সেখানে নেতাদের মধ্যে আলোচনার ফলাফলের ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স