হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের কোনো রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যে সময়ে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে, সেই সময় বিবেচনা করেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের নিজেদের সমর্থন নির্ধারণ করা উচিত।
শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বনানী পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অতীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ব্যবহার করে অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেরাই বিচার করবেন, কোন সময়ে তাঁদের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের কারও ভোটব্যাংক হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনারা আপনাদের বিবেকের কাছেই দায়ী থাকবেন।’ তিনি আরও বলেন, যে সময়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ পাবেন, পাশাপাশি সর্বোচ্চ বরাদ্দ ও ছুটি পাবেন, সেই সময়ে তাঁদের সর্বোচ্চ সমর্থনও প্রত্যাশা করা যেতে পারে।
ভোট ও রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে বক্তব্য
বনানী পূজামণ্ডপে দেওয়া বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ দুর্গাপূজার আয়োজন, সরকারি বরাদ্দ, ছুটি এবং রাজনৈতিক সমর্থনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, এবার সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক পূজামণ্ডপ হয়েছে, বরাদ্দ ও ছুটিও সর্বোচ্চ। পাশাপাশি উৎসবের আনন্দের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এবার আমাদের সংখ্যার দিক থেকে সর্বোচ্চ পূজামণ্ডপ, এবার সর্বোচ্চ বরাদ্দ, সর্বোচ্চ ছুটিও এবার, সর্বোচ্চ আনন্দ উৎসবও এবার, ভোটও হয়েছে সর্বোচ্চ এবার, তবে আবারও হবে। লাস্টেরটা রাজনৈতিক কথা বললাম, আপনারা সবাই বুঝে গিয়েছেন।’
বক্তব্যের শেষাংশে আবার ভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পূর্বনির্ধারিত আনুগত্যের পরিবর্তে নিজেদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে নাগরিকদের সমর্থন দেওয়া উচিত।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অতীতে অনেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। তবে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সিটিজেন (নাগরিক) হিসেবে, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে, আপনারা নিজেরাই বিচার করবেন আপনারা কোন সময়ে, কোন গণতান্ত্রিক সময়ে, আপনাদের সকল গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে, বিচার আপনাদের।’
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্ব
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি ধর্মের মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস, রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে। এসব বিষয় মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই প্রত্যেকের উচিত অন্য ধর্মের মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা।
তিনি বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতার বিকল্প নেই। প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী যেন স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারও এ নীতিতে বিশ্বাস করে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগামী বছরগুলোতেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যেন শারদীয় দুর্গাপূজাসহ সব ধর্মীয় উৎসব স্বাধীনভাবে, সুন্দরভাবে ও আনন্দের সঙ্গে উদ্যাপন করতে পারেন, সে জন্য সরকার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি উৎসব উদ্যাপনে নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বনানী পূজামণ্ডপের আয়োজনের প্রশংসা
বনানী পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, অনেকে এই মণ্ডপকে দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ পূজামণ্ডপ হিসেবে বিবেচনা করেন।
দেশীয় সংস্কৃতি, উপকরণ, আবহ ও নকশার সমন্বয়ে মণ্ডপটি যেভাবে সাজানো হয়েছে, তা প্রশংসনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় পূজার আয়োজকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মঙ্গল, সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির যে প্রকাশ ঘটে, তা অব্যাহত রাখার ওপরও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘অন্ধকারের পর আলোর জয় হয়’: তাবিথ আউয়াল
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালও বক্তব্য দেন। দুর্গাপূজার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, সারা দেশে উৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে। মা দুর্গার আগমন মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, কঠিন অন্ধকারের রাতের পরও আলোর জয় হয়।
তিনি বলেন, ‘আজকে পুরো দেশে উদ্যাপন হচ্ছে। এই উদ্যাপনে আমাদের দুর্গা মা মনে করিয়ে দেয় যে সবচেয়ে কঠিন অন্ধকার রাতের পরে কিন্তু আলোর জয় হয়।’
এরপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তাবিথ আউয়াল বলেন, দীর্ঘদিনের অন্ধকার রাজনৈতিক সময় পেরিয়ে বাংলাদেশের মানুষ জয়ী হয়েছেন এবং দেশকে উদ্ধার করেছেন। এ বক্তব্যে তিনি দুর্গাপূজার প্রতীকী তাৎপর্যের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টি যুক্ত করেন।
দেশে শান্তি চান পুলিশপ্রধান
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, দুর্গাপূজার মূল তাৎপর্যের একটি হলো অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই। মা দুর্গার দশ হাতের প্রতীকী শক্তির মাধ্যমে এসব অনাচার দূর করার বার্তা পাওয়া যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশের দায়িত্বের সঙ্গে এ বিষয়টির তুলনা করে আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশও অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য দূর করতে কাজ করে। দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের প্রত্যাশা।
তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ন্যায়বিচার এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্ব উঠে আসে। ধর্মীয় উৎসবের সময় সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নে উৎসব পালনের পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও এ ধরনের আয়োজনের প্রাসঙ্গিক দিক।
বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের উপস্থিতি
বনানী পূজামণ্ডপের অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও তাঁদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে নেপাল, ভ্যাটিকান, সুইডেন, নরওয়ে ও ক্যামেরুনের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
অনুষ্ঠানে কূটনীতিকেরা দুর্গাপূজা উদ্যাপন নিয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তাঁদের কেউ কেউ বাংলায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়ে উৎসবের প্রতি নিজেদের আন্তরিকতা ও উচ্ছ্বাস তুলে ধরেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বনানী ও গুলশান সোসাইটির সভাপতিরা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজনটি ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতির একটি পরিসর তৈরি করে।
নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সমর্থন নির্ধারণের প্রশ্ন। তিনি তাঁদের কোনো দলের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা না করে নিজেদের বিবেক ও অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে ধর্মীয় উৎসব পালনে স্বাধীনতা, সরকারি সহযোগিতা এবং অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি। অন্যদিকে, তাবিথ আউয়াল ও আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যে যথাক্রমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীকী ব্যাখ্যা এবং অন্যায়-অবিচার দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা উঠে আসে।
সব মিলিয়ে বনানী পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে দেওয়া বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক সমর্থন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভোট ও রাজনৈতিক সমর্থনসংক্রান্ত বক্তব্যের পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার বাস্তবে কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধিকারগুলোর বাস্তব প্রয়োগই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।