বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দলীয়করণের অভিযোগ তুলে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার। এভাবে চলতে থাকলে বর্তমান সরকারের পরিণতিও শেখ হাসিনার সরকারের মতো হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে অন্য লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে তা পূরণ হচ্ছে না; বরং বৈষম্যের নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে গাজীপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আবদুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬ সালের রুকন (সদস্য) সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াতের আমির।
সম্মেলনে সরকারের বিচার ও শিক্ষা বিভাগ পরিচালনা, গণভোটের রায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি। পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয়ভাবে কাজ করে বিজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
‘আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে সরকার’
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারও একই ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বন্ধ করার মতো বিষয়গুলোতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দলীয়করণ নিয়ে তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘটনা বা প্রমাণ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা বক্তব্যের সরবরাহ করা বিবরণে স্পষ্ট নয়।
গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে, তা উপেক্ষা করা হলে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও ন্যায়বিচারভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী ও তরুণ সমাজের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাবের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, সমান অধিকার এবং জবাবদিহি প্রাধান্য পাবে। কিন্তু বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে সেই প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে বৈষম্য বাড়ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘নির্বাচন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়নি’
বিগত নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে প্রচার করেছিল—এমন বক্তব্য তুলে ধরে বিএনপির সমালোচনা করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পর সমস্যার সমাধান হওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সমাজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অন্যায় বেড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে নির্বাচনকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করার পাশাপাশি নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতে, শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই সুশাসন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করাও জরুরি।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাঙ্গনে দলীয়করণ, লুটপাট এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অনিয়মের মাধ্যমে আগের সরকারের মতোই আচরণ করছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে অন্য লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে।’
এ বক্তব্যের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনেও মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন জামায়াত আমির।
স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় নেতা-কর্মীদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জানমাল দিয়ে কাজ করে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন বিএনপির পছন্দের ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে একইভাবে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটছে না।
শফিকুর রহমানের ভাষ্য, এর ফলে দেশে কার্যত দুই ধরনের সরকারব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। একটি জনগণের ভোটের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, অন্যটি ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় পছন্দের লোক বসানোর মাধ্যমে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে আসছে।
প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে অনিয়মের অভিযোগও তোলেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, পছন্দের লোকদের দায়িত্বে বসিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থের পরিপন্থী।
সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তাঁর অভিযোগের তাৎপর্য।
তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনে এ ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করছে, সে বিষয়ে বক্তব্যের সরবরাহ করা বিবরণে সুনির্দিষ্ট নাম বা তথ্য উল্লেখ নেই।
স্থানীয় নির্বাচনে নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতির আহ্বান
সম্মেলনে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক প্রস্তুতির ওপর জোর দেন শফিকুর রহমান। নেতা-কর্মীদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থেকে জনগণের সমর্থন অর্জন এবং নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর এ আহ্বান জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি, প্রার্থী বাছাই কিংবা নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে সরবরাহ করা বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসন ও জবাবদিহি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের রুকন সম্মেলনে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দলীয়করণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রাধান্য পেয়েছে। পাশাপাশি গণভোটের রায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
জামায়াত আমিরের বক্তব্যের মূল দাবি হলো, সরকার পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। তাঁর মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে বিচার ও শিক্ষা বিভাগের নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং স্থানীয় সরকারে জনগণের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে, তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত দুর্নীতি, লুটপাট, দলীয়করণ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, টঙ্গীর রুকন সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুর রহমান বর্তমান সরকারের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে সরকারের প্রতি সতর্কবার্তার পাশাপাশি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বানও উঠে এসেছে।