ঢাকা

নেহা বোরার মুক্তির পর দীপকের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলল সিজেপি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ইসরায়েলের জায়নবাদী আদর্শের কঠোর সমালোচনা করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ৯৬ বছর বয়সী ইহুদি ধর্মীয় নেতা রাবাই ডভ লান্দো। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা প্রায় এক বছর আগের একটি ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, জায়নবাদ ইহুদিদের জন্য দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। তাঁর মতে, ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্র না থাকলেও আরবদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করা সম্ভব ছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক বা ফিলিস্তিনি শাসনব্যবস্থার অধীনেও ইহুদিরা নিরাপদে থাকতে পারতেন বলে মত দিয়েছেন তিনি।

লান্দোর এই বক্তব্য ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। কারণ, তিনি দেশটির কট্টরপন্থী ইহুদি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতা। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোটের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের (ইউটিজে) সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দল দেগেল হাতোরাহর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবেও তাঁর প্রভাব রয়েছে।

সামনে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচন। তার আগে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে কট্টরপন্থী ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নটি রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জায়নবাদ, ইসরায়েল রাষ্ট্রের ধারণা এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে লান্দোর মন্তব্য ক্ষমতাসীন জোটের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী রাজনীতিকেরা তাঁর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ একে জায়নবাদবিরোধী, কেউ ইহুদিবিদ্বেষী, আবার কেউ সেনাবাহিনীর প্রতি অবমাননাকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, লান্দোর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে তাঁর ধর্মীয় অবস্থান, কট্টরপন্থী ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধর্মীয় দলগুলোর ভূমিকা বোঝা জরুরি।

কে এই ডভ লান্দো?

ডভ লান্দো ইসরায়েলের লিথুয়ানীয় ধারার অতি-অর্থোডক্স বা কট্টরপন্থী ইহুদি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা। ৯৬ বছর বয়সী এই রাবাই পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং লিথুয়ানীয় ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইয়েশিভার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ইসরায়েলের বনে ব্রাক শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী ইয়েশিভার প্রধান এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের নীতিনির্ধারণী পরিসরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ইহুদি ধর্মীয় পরিভাষায় ‘রাবাই’ বলতে ধর্মীয় শিক্ষক, ব্যাখ্যাকারী ও সম্প্রদায়ের পথপ্রদর্শককে বোঝায়। অতি-অর্থোডক্স ইহুদি সমাজে প্রভাবশালী রাবাইদের মতামত শুধু ধর্মীয় আচরণেই নয়, শিক্ষা, সামরিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও অনুসারীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

লান্দোর গুরুত্ব এখানেই। তিনি কেবল ধর্মীয় বক্তা নন; তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ইসরায়েলের একটি প্রভাবশালী ধর্মীয়-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অবস্থানও জড়িয়ে আছে। দেগেল হাতোরাহর আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তাঁর মতামত দলটির রাজনৈতিক অবস্থান ও অনুসারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।

দেগেল হাতোরাহ ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম জোটের অংশ। এই জোট ইসরায়েলের সংসদীয় রাজনীতিতে কট্টরপন্থী ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিভিন্ন সময়ে সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ফলে জায়নবাদ নিয়ে লান্দোর মন্তব্যকে শুধু একজন ধর্মীয় নেতার ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। তাঁর অবস্থান ইসরায়েলের ধর্মীয় রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

জায়নবাদ নিয়ে কেন এমন মন্তব্য?

জায়নবাদ মূলত ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখার রাজনৈতিক আন্দোলন। আধুনিক জায়নবাদ উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপে বিকশিত হয়। ইহুদিদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের সমর্থকেরা একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তব রূপ পায়।

তবে জায়নবাদ নিয়ে ইহুদি সমাজের ভেতরেও দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। অনেক ইহুদির কাছে এটি জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার প্রতীক। আবার কিছু ধর্মীয় গোষ্ঠী মনে করে, ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের মৌলিক বিরোধ রয়েছে।

ডভ লান্দোর বক্তব্য এই দ্বিতীয় অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, জায়নবাদ ইহুদিদের জাগতিক ও আত্মিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁর মতে, এই আদর্শের কারণে আরবদের সঙ্গে ইহুদিদের সম্পর্ক বৈরিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

লান্দোর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ইহুদিদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য আলাদা রাষ্ট্রকে অপরিহার্য বলে মনে করেন না। বরং তাঁর ধারণা, ইহুদিরা রাষ্ট্র ছাড়াও আরবদের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারতেন। আন্তর্জাতিক বা ফিলিস্তিনি শাসনব্যবস্থার অধীনেও তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারত বলে তিনি মত দিয়েছেন।

এ ধরনের অবস্থান ইসরায়েলের মূলধারার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমির ধারণা। লান্দোর বক্তব্য সেই ধারণার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

তবে তাঁর মন্তব্যকে সব ইহুদি বা সব অতি-অর্থোডক্স ইহুদির অভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইহুদি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে জায়নবাদ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। লান্দোর বক্তব্য সেই মতভেদেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ধর্মীয় ইহুদিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব

ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় ইহুদি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। বিশেষ করে অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের একটি অংশ ধর্মীয় অধ্যয়নকে জীবনের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের অনেকের কাছে তোরাহ ও তালমুদ অধ্যয়ন, ইয়েশিভায় শিক্ষা এবং ধর্মীয় বিধিবিধান অনুসরণ করাই সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইসরায়েলের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু ক্ষেত্রে বিরোধ তৈরি হয়। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সামরিক দায়িত্ব পালন, কর দেওয়া এবং অন্যান্য সামাজিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রশ্নে অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ ও জাতীয়তাবাদী জনগোষ্ঠীর মতপার্থক্য রয়েছে।

লান্দোর বক্তব্যে এই দ্বন্দ্বের আরেকটি দিক উঠে এসেছে। তিনি শুধু জায়নবাদী আদর্শের সমালোচনা করেননি; ধর্মীয় পরিচয় ও সামরিক দায়িত্বের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় বিশ্বাসকে রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের অধীন করার বিরোধিতা স্পষ্ট।

অন্যদিকে, জায়নবাদী রাজনীতির সমর্থকদের কাছে ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও টিকে থাকার জন্য সেনাবাহিনী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। এ কারণে সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়ে আছে।

সেনাবাহিনীতে যোগদান নিয়ে লান্দোর অবস্থান

লান্দোর বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো সেনাবাহিনীতে যোগদান ও সামরিক অভিযানের সমালোচনা। প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি জায়নবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ধর্মীয় সেনাদেরও সমালোচনা করেন।

আল–জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লান্দো বলেন, ‘এই সেনারা প্রাণ হারাচ্ছেন, কারণ তাঁদের রাবাইরা তোরাহ বিকৃত করে শেখাচ্ছেন।’

তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, কিছু ধর্মীয় নেতা ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করছেন, যা অনুসারীদের রাষ্ট্রের সামরিক প্রকল্পে যুক্ত হতে উৎসাহিত করে। লান্দোর দৃষ্টিতে, এ ধরনের ব্যাখ্যা ধর্মীয় শিক্ষার যথার্থতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি আরও দাবি করেন, ইসরায়েলের অনেক সামরিক অভিযান মানুষের জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় না; বরং রাষ্ট্রের অহংকার ও জাতীয়তাবাদী অবস্থান বজায় রাখার জন্য পরিচালিত হয়।

এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে লান্দো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রচলিত যুক্তির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। তবে তাঁর এই মূল্যায়ন একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেওয়া। সামরিক অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিভিন্ন মত রয়েছে, আর লান্দোর বক্তব্যের সমালোচকেরা তাঁর অবস্থানকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা খাটো করে দেখার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধেও কঠোর বক্তব্য

লান্দোর সমালোচনা শুধু জায়নবাদী রাজনীতি বা সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভিডিওতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধেও কঠোর মন্তব্য করেন।

তাঁর দাবি, ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক নেই এবং তাঁরা ধর্মদ্রোহ ও অবিশ্বাসের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন।

এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের সমাজে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ সামনে এসেছে। ইসরায়েলে একদিকে ধর্মীয় বিধিবিধানকে রাষ্ট্র ও সমাজের কেন্দ্রে রাখার পক্ষে থাকা গোষ্ঠী রয়েছে, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকেরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন।

এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব শুধু সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় বিতর্ক নয়; রাজনীতি, শিক্ষা, সামরিক দায়িত্ব এবং নাগরিক অধিকার নিয়েও এর প্রভাব রয়েছে। লান্দোর মন্তব্যে ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের সম্পর্কে তাঁর কঠোর অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে, যা দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও দৃশ্যমান করেছে।

রাজনীতিকদের ক্ষোভ, জায়নবাদবিরোধিতার অভিযোগ

লান্দোর বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ইসরায়েলের একাধিক রাজনীতিক এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিশেষ করে বিরোধী শিবিরের নেতারা তাঁর মন্তব্যকে ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয় ও সেনাবাহিনীর প্রতি অবমাননাকর বলে বর্ণনা করেছেন।

বিরোধী জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী এবং ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট বলেছেন, লান্দোর বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য এবং এটি সরাসরি জায়নবাদবিরোধিতার প্রকাশ।

প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ তাঁর মন্তব্যকে প্রতিটি ইহুদির জন্য ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও লান্দোর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, এই বক্তব্য ইহুদিবিদ্বেষী, জায়নবাদবিরোধী এবং সরাসরি সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: লান্দোর বক্তব্যকে জায়নবাদবিরোধী বা ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যা দেওয়া এসব রাজনীতিকের নিজস্ব মূল্যায়ন। জায়নবাদের সমালোচনা এবং ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ এক বিষয় নয়। তবে লান্দোর বক্তব্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদিদের সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য থাকায় তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।

এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য দেশটির রাজনীতিতে কতটা সংবেদনশীল বিষয়।

নীরব নেতানিয়াহু, বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপ

লান্দোর ভিডিও নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি বলে আল–জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিরোধিতা করে লান্দো যখন গত জুলাইয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তখন নেতানিয়াহু তাঁর সমালোচনা করেছিলেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর নীরবতা নিয়ে বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ক্ষমতাসীন জোট টিকিয়ে রাখতে কট্টরপন্থী ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে লান্দোর বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে জোটের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটস দলের প্রধান ইয়ার গোলান সরাসরি নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, নেতানিয়াহু নীরব রয়েছেন, কারণ লান্দো ও তাঁর অনুসারীদের সমর্থন ছাড়া সরকারের টিকে থাকা কঠিন। গোলানের বক্তব্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর কাছে ক্ষমতায় থাকা এবং সরকার টিকিয়ে রাখার বিষয়টি আদর্শিক বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এটি বিরোধী দলের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। নেতানিয়াহু কেন ভিডিও নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি, তার ব্যাখ্যা তিনি নিজে দেননি। তবে তাঁর সরকারের সংসদীয় সমীকরণে ধর্মীয় দলগুলোর ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বর্তমান বিতর্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।

ইউটিজেকে বাদ দেওয়ার দাবি কেন উঠছে?

লান্দোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিসরের কারণে বিতর্কটি ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম বা ইউটিজেকে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধী নেতাদের একটি অংশ দাবি তুলেছেন, ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এই জোটকে শরিক করা উচিত নয়।

তাঁদের যুক্তি, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে সরকারে জায়গা দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বজায় রাখার জন্য নেতানিয়াহুকেও সমালোচনা করছেন তাঁরা।

তবে ইউটিজের অবস্থান ও লান্দোর ধর্মীয় বক্তব্যকে পুরোপুরি এক করে দেখা জটিল। একটি রাজনৈতিক জোটের নীতিগত অবস্থান, তার বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং একজন ধর্মীয় নেতার বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। লান্দোর বক্তব্যের কারণে ইউটিজের সঙ্গে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত ইসরায়েলের সংসদীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় দলগুলোর প্রভাবকে ঘিরে।

নির্বাচনের আগে ৬১ আসনের সমীকরণ

ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য নেসেটে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। এ কারণে ছোট দলগুলোর সমর্থনও অনেক সময় সরকার গঠন ও টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। চ্যানেল ১২-এর একটি জরিপে ইউটিজের আটটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

জরিপের এই হিসাব সঠিক হলে, ইউটিজের মতো ধর্মীয় জোটের সমর্থন নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, লান্দোর বক্তব্যের কারণে দলটির সঙ্গে জোটের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক বাড়লে বিরোধীদের জন্য ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে জরিপের ফল নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নয়। নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তিত হতে পারে, আর জোট গঠনের হিসাবও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বদলে যেতে পারে। তাই জরিপের তথ্যকে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার একটি নির্দেশক হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে নয়।

নেতানিয়াহুর জন্য দ্বিমুখী রাজনৈতিক চাপ

ইসরায়েলবিষয়ক বিশ্লেষক ইহাব জাবারিনের মতে, লান্দোর বক্তব্য নেতানিয়াহুকে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু যদি লান্দোর বক্তব্যের কঠোর জবাব দেন, তাহলে সরকার টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমর্থন হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর নীরব থাকলে বিরোধীরা তাঁকে এমন এক নেতারূপে তুলে ধরতে পারে, যিনি নিরাপত্তা ও জায়নবাদের কথা বললেও রাজনৈতিকভাবে এমন একটি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল, যারা জায়নবাদেরই সমালোচনা করে।

এই বিশ্লেষণ ইসরায়েলের জোট রাজনীতির একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরে। সরকার পরিচালনার জন্য সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, আর সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ছোট ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু জোটের কোনো শরিক বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতার বক্তব্য ক্ষমতাসীন দলের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।

নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই শুধু লান্দোর বক্তব্যের সঙ্গে একমত বা দ্বিমত হওয়ার নয়। একই সঙ্গে তাঁকে জোটের স্থিতিশীলতা, সেনাবাহিনী নিয়ে জনমত এবং জায়নবাদী পরিচয়ের প্রশ্ন সামলাতে হচ্ছে।

জায়নবাদ, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

ডভ লান্দোর বক্তব্য ইসরায়েলের ভেতরে চলমান কয়েকটি মৌলিক বিতর্ককে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রথমটি হলো, ইহুদিদের নিরাপত্তা ও জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র কতটা অপরিহার্য। দ্বিতীয়টি হলো, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত। তৃতীয়টি হলো, রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সমাজের সব নাগরিকের মধ্যে কীভাবে ভাগ হবে।

জায়নবাদের সমর্থকেরা সাধারণত ইহুদিদের ইতিহাসে নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি দেন। বিপরীতে, লান্দোর মতো কিছু ধর্মীয় নেতা মনে করেন, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং ইহুদিদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হতে পারে।

একইভাবে, সেনাবাহিনীতে ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের যোগদান নিয়ে বিতর্কের পেছনেও রয়েছে ভিন্ন দায়িত্ববোধের ধারণা। এক পক্ষ মনে করে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। অন্য পক্ষের কাছে ধর্মীয় অধ্যয়ন ও ধর্মীয় জীবনধারার সুরক্ষা আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

লান্দোর বক্তব্যে এই মতপার্থক্য তীব্র ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর সমালোচকেরা একে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি ও সেনাবাহিনীর প্রতি আঘাত হিসেবে দেখছেন; অন্যদিকে, তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তিনি জায়নবাদী রাষ্ট্রধারণার সঙ্গে ধর্মীয় ইহুদি পরিচয়ের সম্পর্ককে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন।

নির্বাচনের আগে এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ, ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থন, সামরিক নিয়োগের নীতি এবং ইসরায়েলের জাতীয় পরিচয়—এই তিনটি বিষয়ই সরকার গঠন ও রাজনৈতিক জোটের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত।

সব মিলিয়ে, ডভ লান্দোর মন্তব্য শুধু জায়নবাদ নিয়ে একটি ধর্মীয় বিতর্ক নয়; এটি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয়, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সামরিক দায়িত্ব এবং ক্ষমতার রাজনীতির মধ্যকার টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন। তাঁর বক্তব্যের পর রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া এবং ইউটিজেকে ভবিষ্যৎ সরকারে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখাচ্ছে—ইসরায়েলে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক এখনো দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স