ঢাকা

শেষকৃত্যের শোকের মধ্যে গুলির শব্দ, জর্ডানে প্রাণ হারালেন ৭ জন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

বিকট শব্দের পর গির্জায় ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি, আহত ৩৪; ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলেছে সরকার, হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানে একটি গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলার সময় বন্দুক হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩৪ জন। শুক্রবার কারাক প্রশাসনিক অঞ্চলের হামুদ এলাকার একটি গ্রামে অবস্থিত গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় এ হামলা হয়। ঘটনার পরপরই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী।

জর্ডানের জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের পরিচালক ওবাইদুল্লাহ আল-মায়েতাহ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত অন্যদের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।

হামলার সময় গির্জাটিতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার পর হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এর পরপরই সন্দেহভাজন বন্দুকধারীরা গির্জার ভেতরে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। কয়েক মিনিট ধরে চলা এই হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

হামলার উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলার সময় হঠাৎ হামলা

হামলার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে বেশ কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর বন্দুকধারীরা গির্জায় প্রবেশ করে গুলি চালায়।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া খালেদ বুরকান জর্ডানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মামলাকাকে বলেন, সেখানে বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ করেই হামলা শুরু হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন হামলাকারীদের একজনের হাতে পিস্তল এবং অন্যজনের হাতে রাইফেল ছিল।

হামলার আকস্মিকতায় গির্জায় উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুলিতে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তবে হামলাকারীরা কীভাবে গির্জায় প্রবেশ করেছিল এবং হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা পাওয়া গিয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।

ঘটনার পর গির্জা ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মামলাকার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

‘জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানতে দেওয়া হবে না’

হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের অঙ্গীকার করেছেন জর্ডানের জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের পরিচালক ওবাইদুল্লাহ আল-মায়েতাহ। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরতে অভিযান চলছে।

তিনি বলেন, ‘তাঁদের পাকড়াও করা হবে। আমাদের জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানতে দেওয়া হবে না।’

জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজেন আল-ফারায়া এ ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এটি একটি নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা। তাঁর দাবি, এমন একটি গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে, যাদের সঙ্গে মানবতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠন বা গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেননি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের দেশকে কখনোই সন্ত্রাস ও সহিংসতার পথে টেনে নেওয়া যাবে না।’

সরকারের পক্ষ থেকে হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এর পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের পরিচয়, উদ্দেশ্য এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।

কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার বাদশাহর

হামলার ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। দেশটির কর্তৃপক্ষ হামলাকারীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।

গির্জায় হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তবে হামলার সঙ্গে ধর্মীয় বিদ্বেষ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

জর্ডানের কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কারাক অঞ্চলে আগেও প্রাণঘাতী হামলা

জর্ডানের কারাক অঞ্চল অতীতেও প্রাণঘাতী হামলার সাক্ষী হয়েছে। ২০১৬ সালে কারাকের একটি প্রাচীন দুর্গে অবস্থান নিয়ে হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং কানাডার এক পর্যটকসহ অন্তত ১০ জনকে হত্যা করেছিল।

ওই ঘটনার সঙ্গে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জড়িত ছিল বলে জানানো হয়েছিল। সে সময় জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হামলাকারীরা নিহত হয়।

তবে ২০১৬ সালের ওই হামলা এবং শুক্রবারের গির্জায় বন্দুক হামলার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান হামলার দায়ও তাৎক্ষণিকভাবে কেউ স্বীকার করেনি।

তদন্তে এখন হামলাকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্যের খোঁজ

গির্জায় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় চালানো হামলায় সাতজনের মৃত্যু এবং ৩৪ জনের আহত হওয়ার ঘটনায় জর্ডানজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করছে।

তদন্তে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—হামলাকারীরা কারা, কী উদ্দেশ্যে তারা গির্জায় হামলা চালিয়েছে এবং কোনো সংগঠন বা নেটওয়ার্ক তাদের সহায়তা করেছে কি না। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

হামলার দায় স্বীকার না করা এবং কোনো গোষ্ঠীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে না আসায় ঘটনার পেছনের কারণ এখনো অজানা। তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হলে হামলার পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আপাতত হতাহতদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা জোরদার এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারই জর্ডানের কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স