ঢাকা

প্যারিসের অদূরে গুলির ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া মাখোঁর, বললেন ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী’ হামলা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ট্রাপেস ও পার্শ্ববর্তী লা ভেরিয়ের শহরে গুলির ঘটনায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। ঘটনাটিকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী’ হামলা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে।

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে গুলিতে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার ঘটনাকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী’ হামলা বলে অভিহিত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তাঁর অভিযোগ, হামলাকারী মানুষের গায়ের রং ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের লক্ষ্যবস্তু করেছেন। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গতকাল শুক্রবার সকালে প্যারিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ট্রাপেস শহরে একটি গাড়ি থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন এক ব্যক্তি। পরে তিনি পাশের লা ভেরিয়ের শহরেও গুলি চালান। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা এ ঘটনায় একজন নিহত হন এবং পাঁচজন আহত হন। পরে লা ভেরিয়ের থেকে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর। তাঁদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। ঘটনাটিকে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করেছে ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর (পিএনএটি)।

‘গায়ের রং ও ধর্মের কারণে লক্ষ্যবস্তু’

ঘটনাস্থল ট্রাপেস পরিদর্শনে গিয়ে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, হামলাকারী মানুষের গায়ের রং ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের নিশানা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ফ্রান্সে এ ধরনের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আগে ঘটেনি।

মাখোঁ বলেন, সমাজে কিছু ‘মতাদর্শ’ ক্রমেই শিকড় গাড়ছে। এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে আক্রমণের শিকার হতে দেওয়া যাবে না।

তবে হামলাকারীর উদ্দেশ্য এবং ঘটনাটির সঙ্গে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি।

সন্ত্রাসবিরোধী দপ্তরের তদন্ত

ফ্রান্সের জাতীয় সন্ত্রাসবিরোধী কৌঁসুলির দপ্তর জানিয়েছে, ঘটনাটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম কেভিন টি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পিএনএটির তথ্য অনুযায়ী, অতীতে চারটি অপরাধে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবে ওই অপরাধগুলোর রেকর্ড পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তির বয়স ৩৯ বছর। পুলিশ তাঁকে আগে থেকেই চিনত, তবে তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে ছিলেন না।

পিএনএটি আরও জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ফ্রান্সের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন না। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের একজন সদস্যকেও আটক করা হয়েছে। তবে ওই ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিভিন্ন স্থানে গুলি চালান সন্দেহভাজন

ট্রাপেসের মেয়র আলি রাবেহের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে লোকজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। তাঁর ধারণা, হামলাকারী যত বেশি সম্ভব মানুষকে হতাহত করতে চেয়েছিলেন।

মেয়র জানান, ট্রাপেসে একটি পেট্রলপাম্প, একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ও শিশুদের খেলার মাঠের কাছাকাছি গুলির ঘটনা ঘটে। পরে সন্দেহভাজন ব্যক্তি পাশের লা ভেরিয়ের শহরের দিকে যান। সেখান থেকেই তাঁকে আটক করে পুলিশ।

ঘটনাস্থল ও হামলার ধরন নিয়ে তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র, সন্দেহভাজন ব্যক্তির পূর্ববর্তী অপরাধের ইতিহাস এবং সম্ভাব্য উদ্দেশ্য—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে।

গুলিবিদ্ধ ১২ বছরের শিশুর শরীরে আটটি ক্ষত

হামলায় আহত ১২ বছর বয়সী শিশুটির মা ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএলকে জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের শরীরে আটটি গুলির ক্ষত রয়েছে। অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছে শিশুটিকে।

নিজের সন্তানের ওপর এমন হামলার ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে, তা নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কেউ একটি শিশুর সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে?’

শিশুটির মা আরও বলেন, ঘটনার সময় তাঁর মেয়ের মাথায় স্কার্ফ ছিল। এ কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘সে ফ্রান্সে জন্মেছে। ফ্রান্সে বসবাস করার এবং এখানে নিজের জীবন গড়ে তোলার অধিকার তার আছে।’

শিশুটির মায়ের বক্তব্যে হামলার সম্ভাব্য ধর্মীয় বা জাতিগত উদ্দেশ্য নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। তবে স্কার্ফ পরার কারণে শিশুটিকে লক্ষ্য করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার অস্ত্র ব্যবহারের খবর

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি আধা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। এ ধরনের অস্ত্র দিয়ে পরপর একাধিক গুলি ছোড়া সম্ভব।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়াঁ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহৃত অস্ত্রটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। তবে অস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট ধরন, সেটি কীভাবে সন্দেহভাজন ব্যক্তির হাতে এল এবং এর বৈধ মালিকানা ছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা

প্রেসিডেন্ট মাখোঁ ঘটনাটিকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী’ হামলা হিসেবে বর্ণনা করলেও তদন্তকারীদের সামনে এখনো বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে। হামলাকারী কেন ওই ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে কোনো উগ্রবাদী মতাদর্শ বা সংগঠনের যোগাযোগ ছিল কি না এবং হামলার আগে কোনো পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর পরিবারের একজন সদস্যকেও আটক করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হামলার উদ্দেশ্য বা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

গুলির ঘটনায় প্রাণহানি ও শিশুসহ কয়েকজন আহত হওয়ার পর ট্রাপেস ও আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে হামলার প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স