ঢাকা

উপাচার্য পদে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে ঘিরে উচ্চশিক্ষা মহলে আবারও জোরালো হয়েছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও যোগ্যতার প্রশ্ন। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অতীতের নানা বিতর্ক সামনে আসায় উপাচার্য নিয়োগের ধরন ও মানদণ্ড পুনর্বিবেচনার দাবি তুলছেন শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব নয়—যোগ্যতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও গবেষণায় স্বীকৃত অবদানই হওয়া উচিত উপাচার্য নিয়োগের প্রধান ভিত্তি।

শিক্ষক নিয়োগে বিতর্ক, প্রশ্নের মুখে নেতৃত্ব

বিগত সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে উপাচার্যই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সততা ও নৈতিক অবস্থান শিক্ষক নিয়োগের মান নির্ধারণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

শিক্ষাবিদদের মতে, একজন যোগ্য ও নিরপেক্ষ উপাচার্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আস্থার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। নতুন সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা—উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে একাডেমিক উৎকর্ষ ও নেতৃত্বগুণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

অতীতের অভিযোগ ও ‘জিরো টলারেন্স’ প্রশ্ন

অতীতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্যের পরিবারের ৯ সদস্যসহ ৭৩ জন শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তদন্তে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসংগতি পাওয়ার কথা জানায়। একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে একাধিক উপাচার্যের বিরুদ্ধে।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)–এর এক সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে ইউজিসির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। অধিকাংশ নিয়োগ নিকটাত্মীয়দের হওয়ায় তা শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

শিক্ষা প্রশাসনে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর না হলে এসব অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন—এমন মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের প্রশ্ন, একজন উপাচার্যের পরিবারের একাধিক সদস্য একই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পান কীভাবে? নিয়োগ নীতিমালা ও যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ায় কোথায় ছিল দুর্বলতা?

তদবির সংস্কৃতি ও সিন্ডিকেট গঠন

উচ্চশিক্ষা মহলের একটি অংশ মনে করে, উপাচার্য নিয়োগে তদবির ও রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২–১৯৮০ সময়ে যাঁরা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিতর্কের নজির কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ‘তদবিরের জোরে’ উপাচার্য হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

সমালোচকদের মতে, দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু উপাচার্য নিজেদের অনুগতদের নিয়ে প্রশাসনিক বলয় তৈরি করেন। সিন্ডিকেট ও বিভিন্ন কমিটিতে প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত পাস করানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষকরা উপেক্ষিত হন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সমাধানের পথ: কাঠামোগত সংস্কার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ ও স্বচ্ছ করতে হবে। একাডেমিক এক্সিলেন্সি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকাশনা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বদানের সক্ষমতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—এসব সূচক নির্ধারণ করে মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে পারে। প্রয়োজনে অনুসন্ধান কমিটি (সার্চ কমিটি) গঠনের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রস্তুত করে তা প্রকাশ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস, গবেষণাপত্র মূল্যায়ন ও স্বচ্ছ মৌখিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও এসেছে। এতে ব্যক্তিগত প্রভাব ও তদবিরের সুযোগ কমবে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদেরা।

‘নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে উপাচার্য নিয়োগের প্রস্তাব

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—উপাচার্য নিয়োগ সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষকসমাজ থেকে করা। সমর্থকদের যুক্তি, দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকা ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, শক্তি–দুর্বলতা ও একাডেমিক চাহিদা সম্পর্কে ভালো জানেন। ফলে তাঁর দায়বদ্ধতাও বেশি থাকে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ পাওয়া উপাচার্য দায়িত্ব শেষে চলে গেলেও নিজ প্রতিষ্ঠানের উপাচার্য দীর্ঘমেয়াদি ভাবনায় সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী থাকেন।

তবে এ প্রস্তাবের বিপরীতে কেউ কেউ বলেন, বাইরের অভিজ্ঞতা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক সময় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই মূল বিষয় হওয়া উচিত—যোগ্যতা ও সততা; প্রার্থীর প্রতিষ্ঠান নয়।

মর্যাদা ও আস্থার প্রশ্ন

উপাচার্য পদ শুধু প্রশাসনিক নয়, নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীকও বটে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার প্রমাণিত হলে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপসারণের নজির তৈরি হলে অন্যদের জন্য তা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে—এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদদের ভাষ্য, উচ্চশিক্ষা জাতির মেধা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। সেখানে নেতৃত্বের সংকট বা আস্থাহীনতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স