ঢাকা

ভর্তি পরীক্ষার বাইরে সুশিক্ষার বিকল্প ভাবনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

সুইডেন বা ইউরোপের দেশগুলোর জীবনব্যবস্থা ও সামাজিক পরিকাঠামো যে বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে, তা সরাসরি বাংলাদেশের সমাজে প্রয়োগ করা সব সময় সহজ বা প্রাসঙ্গিক নয়। ইতিহাস, অর্থনীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক চর্চার ভিন্নতার কারণে দুই বাস্তবতার তুলনা অনেক ক্ষেত্রেই সরলীকৃত হয়ে যায়। তবুও শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে যদি বাংলাদেশকে একসময় বিশ্বমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হয়, তাহলে প্রস্তুতি শুরু করতে হবে এখনই। সেই ভাবনা থেকেই ইউরোপ, বিশেষ করে সুইডেন-এর শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সম্ভাব্য বিশ্বমানের শিক্ষামডেলের কিছু দিক তুলে ধরা প্রয়োজন।


শিশুশিক্ষা: প্রতিযোগিতা নয়, বিকাশই মূল লক্ষ্য

ইউরোপের শিশুশিক্ষা পদ্ধতি প্রথমে বিস্মিত করে, পরে মুগ্ধ করে। জন্মের প্রথম বছর শিশু সাধারণত পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। এরপর তাকে ডে-কেয়ার বা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করা হয়। শুরুতে মা–বাবার উপস্থিতিতে শিশুর মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলে, ধীরে ধীরে শিক্ষক ও পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি হয়। একসময় সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সময় শিশুর শিক্ষাজীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

এই পর্যায়ে শিশুকে পরীক্ষাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া হয় না। বরং ছয় বছর বয়স পর্যন্ত খেলাধুলা, সামাজিকতা, শেয়ারিং, মানবিক মূল্যবোধ, সহযোগিতা ও আত্মমর্যাদাবোধ—এসবের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুর আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ভিত্তি গড়ে ওঠে এখানেই।

শিশুরা শুধু শেখে না, তারা প্রশ্ন করে, সংশোধন করে, যুক্তি দেয়। পরিবার ও স্কুলের মধ্যে পারস্পরিক শেখার পরিবেশ তৈরি হয়। “Value of teaching is learning from learners”—এই দর্শন বাস্তবে প্রয়োগ হতে দেখা যায়।


ভর্তি ব্যবস্থা: সমান সুযোগের নীতি

সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন নেই। শিশুর বয়স, বসবাসের এলাকা ও অভিভাবকের পছন্দের ভিত্তিতে স্কুল নির্ধারিত হয়। স্থানীয় পৌরসভা প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে।

বিশেষায়িত কিছু প্রতিষ্ঠান—যেমন সংগীত বা প্রতিভাভিত্তিক স্কুল—সীমিত দক্ষতা যাচাই করতে পারে, কিন্তু সাধারণ শিক্ষায় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেই। লক্ষ্য একটাই: প্রাথমিক পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ কমিয়ে শেখার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।


পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন কাঠামো

সুইডেনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা ছয় বছর বয়স থেকে শুরু হয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত চলে। তিনটি স্তরে বিভক্ত এই শিক্ষাব্যবস্থায় ১৬টি বাধ্যতামূলক বিষয় পড়ানো হয়—সুইডিশ ভাষা, গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, প্রযুক্তি, সংগীত, শিল্পকলা, শারীরিক শিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদি।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা ফ্রেঞ্চ, জার্মান বা স্প্যানিশ ভাষার মধ্যে একটি বেছে নিতে পারে। সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মানা হয়।

মূল্যায়ন ব্যবস্থায় ফেল, পাস ও পাস উইথ ডিস্টিংশন রয়েছে। এ, বি, সি, ডি, ই, এফ গ্রেডিং ব্যবস্থায় বি ও ডি ‘ফিলিং গ্রেড’ হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয়, ষষ্ঠ ও নবম শ্রেণিতে জাতীয় মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে ষষ্ঠ শ্রেণির আগে আনুষ্ঠানিক গ্রেডিং করা হয় না—যাতে শিশুদের ওপর অযাচিত চাপ না পড়ে।


উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা: নমনীয়তা ও দক্ষতা

দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক স্তর ‘জিমনেসিয়াম’ নামে পরিচিত। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও প্রায় ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। কারিগরি ও একাডেমিক—দুটি ধারা থাকলেও উভয় পথ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিন বছরের স্নাতক, এক বা দুই বছরের স্নাতকোত্তর এবং দুই থেকে চার বছরের ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। গবেষণায় সরকারি অর্থায়ন ও কাঠামোগত সহায়তার কারণে সুইডেন বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষায় মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সংকট ও সম্ভাবনা

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও বাংলাদেশে মানসম্মত শিক্ষার প্রশ্নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। উন্নয়ন-রূপকল্পে শিক্ষার গুরুত্ব বারবার উচ্চারিত হলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি স্পষ্ট।

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। কর্মসংস্থান নির্ভর করছে গ্লোবাল বাজার, প্রযুক্তি, শেয়ারবাজার, রাজনৈতিক ও জলবায়ু বাস্তবতার ওপর। আজীবন এক চাকরির নিশ্চয়তা নেই। ফলে প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে অভিযোজিত, সৃজনশীল ও স্বনির্ভর করে তুলবে।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো রয়েছে মুখস্থনির্ভরতা, সনদসর্বস্বতা, অসম্পূর্ণ প্রশিক্ষণ ও দুর্বল মনিটরিং। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকলেও সমন্বয়ের অভাব প্রকট। শিশু বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সমন্বিত প্রশিক্ষণ কাঠামো অনুপস্থিত।


বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাব

বাংলাদেশে সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়—যেখানে শিশুশিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষকদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এই প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে—

  • আধুনিক পেডাগজি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদান কৌশল

  • শিশু মনোবিজ্ঞান ও সমাজমনস্ক শিক্ষা

  • গবেষণাভিত্তিক কারিকুলাম উন্নয়ন

  • নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি

  • দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ

শিক্ষকই যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রধান বাহক হন, তবে তাঁদের দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। “Learning by doing” ও “Learning from learners”—এই নীতিকে কেন্দ্র করে প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।


নীতিগত সংস্কার ও সুশাসনের প্রয়োজন

চাহিদাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন—

  • দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো

  • নিয়মিত মনিটরিং ও মূল্যায়ন

  • ডিজিটালাইজেশন

  • কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও জবাবদিহি

  • শিক্ষা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশাসনিক দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়

জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে প্রথম ১৫ বছরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের মানবিক, সৃজনশীল ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে উন্নয়নের সুফল টেকসই হবে না।

বাংলাদেশিরা সক্ষমতা ও মেধায় পিছিয়ে নয়। ঘাটতি রয়েছে দায়বদ্ধ ব্যবস্থাপনায়। সংকট শনাক্ত হয়েছে—এখন প্রয়োজন সমাধান।

বিশেষায়িত শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন সম্ভব।

প্রশ্ন এখন একটাই—
বাংলাদেশ, তুমি কি প্রস্তুত?

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স