বিশ্বরাজনীতির পুরোনো সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ—সব মিলিয়ে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা এখন গভীর অনিশ্চয়তা ও টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির পুরোনো জোট ও নির্ভরতার কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তি নিজেদের প্রভাবের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এমন এক পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছে। বছরের শুরুতে ১ জানুয়ারি থেকে এক বছরের জন্য এই দায়িত্ব পালন করছে নয়াদিল্লি। এর আগে ২০২৫ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্বে ছিল ব্রাজিল।
ভারতের জন্য এই সভাপতিত্ব নিছক আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা, বৈশ্বিক দক্ষিণে নেতৃত্বের দাবি জোরালো করা এবং একই সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশগুলোকে একসঙ্গে রাখার একটি বড় পরীক্ষা।
সম্প্রসারণে শক্তি বেড়েছে, বেড়েছে বিভাজনও
ব্রিকসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এর সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই জোট এখন অনেক বেশি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ যুক্ত হওয়ায় জোটটির অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, সম্প্রসারিত ব্রিকস এখন বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৪ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
অর্থাৎ ব্রিকস এখন আর কেবল কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সমন্বিত একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; বিশ্ব অর্থনীতি ও জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই রয়েছে জোটটির মৌলিক বৈপরীত্য।
সদস্য বাড়ার সঙ্গে ব্রিকসের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ওজন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সদস্যদের পারস্পরিক স্বার্থের পার্থক্য। একদিকে রয়েছে চীন ও ভারত—দুই বৃহৎ এশীয় শক্তি, যারা একই জোটের সদস্য হলেও আঞ্চলিক প্রভাব, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। অন্যদিকে রয়েছে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—যাদের পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান সব সময় এক নয়।
ফলে ব্রিকসের শক্তি যেমন এর বৈচিত্র্য, তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেই বৈচিত্র্য।
ভারতের ঘোষিত লক্ষ্য বনাম কঠিন বাস্তবতা
ভারতের ঘোষিত ব্রিকস সভাপতিত্বের মূলমন্ত্র—‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ’। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহযোগিতামূলক ও মানবকেন্দ্রিক ব্রিকসের একটি ধারণা সামনে আনতে চায়।
কিন্তু একটি অভিন্ন মূলমন্ত্র নির্ধারণ করা এবং ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোকে অভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়ে আসা এক বিষয় নয়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক অমিত রঞ্জন বছরের শুরুতে এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছিলেন, ভারত এমন একটি ব্রিকসের নেতৃত্ব নিয়েছে, যার সদস্যদের মধ্যে বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।
ভারতের সামনে এখন সেই মতপার্থক্যকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখার চ্যালেঞ্জ। কারণ, ব্রিকসের সব সদস্যকে সব বিষয়ে একমত করানো বাস্তবসম্মত নয়। বরং মতবিরোধের মধ্যেও কোন কোন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা সম্ভব, সেটিই ভারতের নেতৃত্বের মূল পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের প্রথম বড় পরীক্ষা চীন
ব্রিকসের ভেতরে ভারতের জন্য সবচেয়ে জটিল সমীকরণ সম্ভবত চীনকে ঘিরে।
দুই দেশই এশিয়ার বড় শক্তি এবং ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতা রয়েছে।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে। যদিও পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পর্যায়েও যোগাযোগ পুনরায় বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা গেছে।
জানুয়ারিতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের একটি প্রতিনিধিদল নয়াদিল্লি সফর করে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করে। গালওয়ান সংঘর্ষের পর এটি দুই দেশের দলীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগগুলোর একটি।
অন্যদিকে শাকসগাম উপত্যকায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দেখা গেছে।
এই বাস্তবতায় ভারতের জন্য ব্রিকসের নেতৃত্ব একই সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার পরীক্ষা।
ব্রিকসকে যদি ভারত চীনবিরোধী কোনো মঞ্চে পরিণত করার চেষ্টা করে, তাহলে জোটটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত সমঝোতার চেষ্টা করলে ভারতের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাই দিল্লির জন্য বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে—চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাকে ব্রিকসের পুরো কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না। যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে, সেখানে সহযোগিতা; আর যেখানে স্বার্থের সংঘাত, সেখানে প্রতিযোগিতা—এই দুই নীতি পাশাপাশি রাখাই ভারতের জন্য কার্যকর কৌশল হতে পারে।
ইরান-আমিরাতের দ্বন্দ্বে প্রকাশ পেল ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা
ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা এসেছে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক থেকে।
১৪ ও ১৫ মে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে সদস্যরা একটি অভিন্ন যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত ভারতকে সভাপতির দায়িত্ব থেকে পৃথক ‘সভাপতির বিবৃতি’ ও ফলাফল নথি প্রকাশ করতে হয়। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথাও সেখানে স্বীকার করা হয়।
ঘটনাটি শুধু একটি বৈঠকে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করতে না পারার বিষয় নয়। এটি ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ্যে এনেছে।
একই সংগঠনের সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, অথচ পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে তাদের অবস্থান এক নয়। এমনকি বৈঠকেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলে।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও জটিল। কারণ ইরানের সঙ্গে দিল্লির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে পড়বে।
অর্থাৎ ব্রিকসকে ঐক্যবদ্ধ রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভারতকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোর আঞ্চলিক বিরোধও সামলাতে হচ্ছে।
ব্রিকস কি পশ্চিমবিরোধী জোট?
ব্রিকস নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জায়গা সম্ভবত এটিই।
জোটটির অনেক সদস্য আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাব কমাতে আগ্রহী। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
কিন্তু সেই মিলকে সরাসরি একটি অভিন্ন পশ্চিমবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গেও দিল্লির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি চলছে।
অতএব ব্রিকসের সদস্যরা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার কিছু দিক পরিবর্তন করতে চাইতে পারে, কিন্তু সবাই পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়—এমন কোনো বাস্তবতা নেই।
বরং ব্রিকসের ভবিষ্যৎ পশ্চিমের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের চেয়ে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের স্বার্থ ও প্রভাব শক্তিশালী করার একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে গড়ে ওঠার ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে।
ভারতের কৌশল: একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক
ব্রিকসের নেতৃত্ব ভারতের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির একটি অংশ মাত্র।
দিল্লি একদিকে ব্রিকসের নেতৃত্ব দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ভারত নিজেকে কোনো একটি শক্তিশিবিরে পুরোপুরি আবদ্ধ না রেখে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে চাইছে।
ব্রিকস সেই কৌশলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ভারত ব্রিকসকে এমন সংগঠনে পরিণত করতে চাইবে না, যা তাকে পশ্চিমা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়। বরং ব্রিকসের মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণে নিজের নেতৃত্বের দাবি জোরালো করা, চীনের সঙ্গে একই মঞ্চে থেকে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখাই দিল্লির জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভারসাম্য রক্ষার নীতিই ভারতের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর ব্রিকসের সভাপতিত্ব সেই নীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি।
আসল সাফল্যের মাপকাঠি কী
ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বের সাফল্য শুধু একটি সফল শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং অন্তত চারটি প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দিল্লি কতটা সফল হয়েছে।
প্রথমত, চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর মধ্যে ভারত কি ন্যূনতম কার্যকর সমঝোতা তৈরি করতে পারে?
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস কি এমন কার্যকর অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা সদস্যদেশগুলোর জন্য বাস্তব সুফল তৈরি করবে?
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে কি বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে?
চতুর্থত, সদস্যসংখ্যা বাড়লেও ব্রিকসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা কীভাবে ধরে রাখা হবে?
এসব প্রশ্নের কোনোটি সহজ নয়। মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, ব্রিকসের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন আর কেবল তাত্ত্বিক সমস্যা নয়; এটি ভারতের সভাপতিত্বের সময় সরাসরি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
ঐকমত্য নয়, মতপার্থক্য সামলানোই হতে পারে সাফল্য
ভারতের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে ব্রিকসের প্রভাব ও পরিধি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া যাবে না, যাতে সদস্যদের বড় অংশ সংগঠনটিকে নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করে।
এখানে ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো সবাইকে একমত করানো নয়; বরং মতপার্থক্যকে এমন পর্যায়ে রাখা, যাতে তা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে অকার্যকর না করে।
ব্রিকসের সব সদস্য কখনোই সব বিষয়ে একমত হবে না। সেটি প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়। বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, উন্নয়ন, জ্বালানি ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নিতে পারলেই রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব।
এই জায়গাতেই ভারতের সভাপতিত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।
ব্রিকস যত বড় হচ্ছে, ততই তার সম্ভাবনা বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সংঘাত। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই ভারতের নেতৃত্বের গুরুত্ব।
নয়াদিল্লির সামনে বড় পরীক্ষা
ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্ব তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব নয়; এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সক্ষমতারও পরীক্ষা।
ভারত কি ব্রিকসকে নিজের প্রভাব বিস্তারের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি ভিন্ন স্বার্থের শক্তিগুলোকে একই টেবিলে রেখে কার্যকর বহুপক্ষীয় মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলবে—মূল প্রশ্ন সেটিই।
কারণ ব্রিকসের শক্তি এখন আর শুধু এর সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক আকারে নয়। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, রাশিয়া-পশ্চিম দ্বন্দ্ব, ইরান-উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরোধ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের মধ্যেও কতটা কার্যকর সহযোগিতা তৈরি করা যায় তার ওপর।
ভারতের জন্য তাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে ‘সব বিষয়ে ঐক্য’ নয়, বরং ‘মতপার্থক্যের মধ্যেও কার্যকর সহযোগিতা’ নিশ্চিত করা।
যদি নয়াদিল্লি সেটি করতে পারে, তাহলে ব্রিকস শুধু সম্প্রসারিত একটি জোট হিসেবেই নয়, পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের একটি কার্যকর কূটনৈতিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর যদি সদস্যদের পারস্পরিক বিরোধ জোটটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যৌথ কার্যক্রমকে ক্রমাগত অকার্যকর করে তোলে, তাহলে অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বিশালতা থাকা সত্ত্বেও ব্রিকসের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
সেপ্টেম্বরের নয়াদিল্লি শীর্ষ সম্মেলন তাই ভারতের জন্য যেমন নেতৃত্বের পরীক্ষা, তেমনি ব্রিকসের জন্যও অস্তিত্ব ও কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এর ফলাফল অনেকটাই দেখিয়ে দেবে—পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকস সত্যিই একটি কার্যকর বহুমেরুকেন্দ্রিক শক্তিতে পরিণত হতে পারবে, নাকি ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের সমষ্টি হিসেবেই থেকে যাবে।