ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানকে ‘নষ্ট-পচে যাওয়া মানুষ’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, সাকিব আল হাসান দেশে ফিরলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলার আইনগত প্রক্রিয়া মোকাবিলার সুযোগও তিনি পাবেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
সাকিব আল হাসানের প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি একজন ভালো ক্রিকেটার হতে পারেন। তবে রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে তাঁকে ‘নষ্ট-পচে যাওয়া মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সাকিব সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ‘অ্যালাইন’ ছিলেন এবং এখনো সেই অবস্থানে রয়েছেন।
তথ্য উপদেষ্টার এমন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অবস্থান, সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে সাকিবের ভূমিকা এবং দেশে ফিরলে তাঁর আইনি অবস্থান—এসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দেশে ফিরলে নিরাপত্তা দেওয়ার আশ্বাস
সাকিব আল হাসান দেশে ফিরলে তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে ফিরলে সাকিব নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ মোকাবিলা করতে পারবেন।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান বা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কারণে রাষ্ট্র তাঁর নিরাপত্তার অধিকার অস্বীকার করবে না। একই সঙ্গে অভিযোগ বা মামলার বিষয় থাকলে তা আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মোকাবিলা করতে হবে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, সাকিব দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চলবে এবং সেই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তিনি পাবেন।
শেখ হাসিনাও দেশে ফিরলে নিরাপত্তা পাবেন
একই সংবাদ সম্মেলনে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গেও কথা বলেন জাহেদ উর রহমান।
তিনি জানান, শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার কথা বলেছেন। তিনি দেশে ফিরলে তাঁকেও পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং তাঁর নাগরিক ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে।
অর্থাৎ সরকারের অবস্থান হলো, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ বা মামলার নিষ্পত্তি রাজনৈতিকভাবে নয়, আদালতের মাধ্যমে হবে।
‘মাফিয়া রেজিম আর দেখতে চাই না’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দেশে আর কোনো ‘মাফিয়া রেজিম’ দেখতে চায় না।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার মতো কোনো ‘ফ্যাসিস্ট মাফিয়া রেজিম’ ভবিষ্যতেও দেশে হতে দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার কাজ করছে।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে একই সঙ্গে অতীত সরকারের রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনা এবং ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার উঠে আসে।
গুরুতর অভিযোগ থাকলেও অধিকার নিশ্চিত করার কথা
সাকিব আল হাসান ও শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ একসঙ্গে তুলে ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, কোনো ব্যক্তি যত গুরুতর অপরাধের অভিযোগেই অভিযুক্ত হন না কেন, তাঁর নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, সাকিব আল হাসান বা শেখ হাসিনা—যিনিই হোন, অভিযোগের বিচার আইন ও আদালতের মাধ্যমে হতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার একদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে, অন্যদিকে তাঁদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার অবস্থানও তুলে ধরেছে।
সাকিবের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত খেলোয়াড়। ক্রিকেটের পাশাপাশি তিনি রাজনীতিতেও সক্রিয় হন এবং জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এবার সরাসরি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কঠোর সমালোচনা এল।
তথ্য উপদেষ্টা অবশ্য একই সঙ্গে দেশে ফিরলে সাকিবের নিরাপত্তা এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সমালোচনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
আইনের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ থাকবে
জাহেদ উর রহমানের বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তাঁর বিচার রাষ্ট্রের নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় হতে হবে। দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁকে আদালত ও আইনের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণের কথা বলেছেন তিনি। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে নিতে হবে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
সরকারের এই অবস্থান অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে কাউকে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হবে না; আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারও বাতিল করা হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও যারা ছিলেন
সচিবালয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদও উপস্থিত ছিলেন।
সাকিব আল হাসান ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে উপদেষ্টার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশে ফেরার পর নিরাপত্তা, অভিযোগের বিচার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে বক্তব্যে সাবেক সরকারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি আইন ও আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।