ঢাকা

১৭ বছর পর ভেনেজুয়েলা-ইসরায়েলের কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালু, নতুন বার্তা সম্পর্কে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দীর্ঘ ১৭ বছর পর আবারও একে অপরের দেশে কনস্যুলার সেবা চালু করতে সম্মত হয়েছে ভেনেজুয়েলা ও ইসরায়েল। মঙ্গলবার দুই দেশের সরকার এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ২০০৯ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পর এটি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা না এলেও কনস্যুলার সেবা চালুর সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের বৈরিতার বরফ গলার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত দেশটির পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

২০০৯ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল ভেনেজুয়েলা

ইসরায়েল ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটে ২০০৮-০৯ সালের গাজা যুদ্ধের সময়। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সরকার ২০০৯ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

চাভেজ সে সময় ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জোরদার করেন। এরপর থেকে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক কার্যত বন্ধ ছিল।

দীর্ঘ এই সময়ে ভেনেজুয়েলা ইসরায়েলের পরিবর্তে ইরানসহ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কয়েকটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। বিশেষ করে হুগো চাভেজের সময় থেকে ইরান ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়।

ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত শুধু দুই দেশের নাগরিকসেবার বিষয় নয়; এর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।

কীভাবে আবার যোগাযোগ শুরু হলো

ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত জুনে দেশটিতে একটি প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর ইসরায়েলের মানবিক সহায়তাবিষয়ক একটি প্রতিনিধিদল ভেনেজুয়েলা সফর করে।

সেই মানবিক সহায়তার প্রেক্ষাপটেই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে সমঝোতা হয়।

ভেনেজুয়েলা সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই সরকারই ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যকার সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করেছে। দেশটির ইহুদি সম্প্রদায়কে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সেতু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই বিবৃতি প্রকাশ করেছে। ফলে কনস্যুলার সেবা চালুর বিষয়ে দুই দেশের সম্মতির বিষয়টি পৃথকভাবে নিশ্চিত হয়েছে।

কনস্যুলার সেবা চালুর অর্থ কী

কনস্যুলার সেবা মূলত বিদেশে বসবাসরত একটি দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও জরুরি সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি, নাগরিকসেবা, জরুরি সহায়তা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু আইনি ও প্রশাসনিক কাজে কনস্যুলার যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৭ বছর ধরে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন থাকায় ভেনেজুয়েলা ও ইসরায়েলের নাগরিকদের এ ধরনের সেবা পেতে তৃতীয় কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে বা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।

এখন নিজ নিজ দেশে কনস্যুলার সেবা চালুর সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের নাগরিকদের জন্য সরাসরি যোগাযোগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হবে।

তবে কনস্যুলার সেবা চালু হওয়া এবং পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা একই বিষয় নয়। বর্তমান ঘোষণায় দুই দেশ কেবল কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্মতির কথা জানিয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

ভেনেজুয়েলার এই সিদ্ধান্তকে দেশটির সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় ধরে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচক এবং ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকা ইরান ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা গড়ে ওঠে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের সমীকরণেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলার সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে কনস্যুলার যোগাযোগ পুনঃস্থাপনও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে।

ইরানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

ইরান বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; জ্বালানি, অর্থনীতি ও বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করেছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উভয় দেশই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের কারাকাসে হস্তক্ষেপের নিন্দাও জানিয়েছে তেহরান। ফলে ভেনেজুয়েলার ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সিদ্ধান্ত ইরান-ভেনেজুয়েলা সম্পর্কের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে কনস্যুলার সেবা চালুর সিদ্ধান্তের ফলে ভেনেজুয়েলা ইরানের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্ক থেকে সরে যাচ্ছে—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা

ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রনীতির এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক।

দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের পর ভেনেজুয়েলা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন ধরনের যোগাযোগ ও সমঝোতার পথে এগোচ্ছে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় ভেনেজুয়েলা-ইসরায়েল সম্পর্কের বরফ গলার ঘটনাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কারাকাসের পরিবর্তিত সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেওয়া ভেনেজুয়েলার জন্য কনস্যুলার যোগাযোগ পুনঃস্থাপন একটি প্রতীকী পরিবর্তন।

তবে এর মাধ্যমে দেশটির ফিলিস্তিননীতি বা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিষয়ে অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে বদলে গেছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভেনেজুয়েলার অবস্থান

হুগো চাভেজের সময় থেকেই ভেনেজুয়েলা ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে এসেছে। ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় দেশটির সরকার নিয়মিত সমালোচনা করেছে।

২০০৯ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার মূল কারণও ছিল গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান।

সেই ইতিহাসের কারণে কনস্যুলার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনকে অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। তবে দুই দেশের সাম্প্রতিক ঘোষণায় ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভেনেজুয়েলার নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের কোনো কথা বলা হয়নি।

বরং কনস্যুলার সেবা চালুর ক্ষেত্রে দুই দেশের নাগরিক এবং ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইহুদি সম্প্রদায়কে ‘সেতুবন্ধ’ হিসেবে দেখছে দুই দেশ

দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের বিশেষ ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ইহুদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরায়েলের ঐতিহাসিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও এই সম্প্রদায় দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে।

এখন কনস্যুলার সেবা চালু হলে ইহুদি সম্প্রদায়সহ ভেনেজুয়েলায় বসবাসরত ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য সরাসরি কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

একইভাবে ইসরায়েলে বসবাসরত ভেনেজুয়েলার নাগরিকদেরও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক কি ফিরছে?

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কনস্যুলার সেবা চালুর পর দুই দেশ কি আবার পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের দিকে এগোবে?

মঙ্গলবারের ঘোষণায় এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা পরিকল্পনা জানানো হয়নি। ফলে কনস্যুলার যোগাযোগ পুনঃস্থাপনকে আপাতত সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে দীর্ঘ ১৭ বছরের বিচ্ছিন্নতার পর সরাসরি কনস্যুলার যোগাযোগ চালুর সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ, ইরানের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য কেবল দুই দেশের নাগরিকসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

২০০৯ সালে গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে সম্পর্ক ছিন্ন করা ভেনেজুয়েলা ১৭ বছর পর আবার ইসরায়েলের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ শুরু করছে। পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হলেও কনস্যুলার সেবা চালুর এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স