ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘর্ষ: পারমাণবিক অস্ত্রের গুরুত্ব বাড়ছে বিশ্বজুড়ে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু স্থানীয় সীমিত যুদ্ধ নয়, বরং বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি অনুসারে, হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এই সংঘাত থেকে টিকে গেলে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়বে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঝুঁকি তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) গত মে মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত আছে। এটি সমৃদ্ধ করলে অন্তত ৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি সম্ভব। এছাড়া, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ২,৫০০, যা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো দেশে নেই।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক রমেশ ঠাকুর বলেন, “ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রই টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তাই তারা কেন এটা তৈরি বা সংগ্রহ করবে না?” একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের সামরিক বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ। তিনি বলেন, ইরানের ব্যালিস্টিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পারমাণবিক বোমা তাদের জন্য দ্রুততম সুরক্ষার পথ।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, ইরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমতের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার সমর্থন রেকর্ড ৭৬.২ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে জাপানও নিজস্ব পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে সীমিতভাবে আলোচনা শুরু করেছে, যদিও ঐতিহাসিক কারণে তারা পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার নীতিতে দৃঢ়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা বা প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরশীলতা দেশগুলোর নিজেদের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা সীমিত করে। তাইওয়ানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রেখেছে, যাতে কট্টরপন্থীরা চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ায়। কাভানাঘের মতে, “নিরাপত্তার গ্যারান্টি আসলে স্থিতিশীলতার চেয়ে মার্কিন স্বার্থের ক্ষতি করে।”

বিশ্লেষকরা একমত যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করতে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক কাঠামো দরকার। এটি নতুন এনপিটি বা সংশোধিত চুক্তি হতে পারে, যেখানে পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও অন্যান্য দেশকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি সন্ত্রাসী বা অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হাতে না পৌঁছানোর তদারকি নিশ্চিত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মত, ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রহীন করা। কিন্তু বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ উল্টো ফল দিচ্ছে—বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্রের চাহিদা ও সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রমেশ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টরা গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী মনে করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী পারমাণবিক সক্ষমতার প্রতি আগ্রহী। এই আগ্রহ ভবিষ্যতেও কমার কোনো সম্ভাবনা নেই, যা বিশ্বব্যাপী নতুন নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করতে পারে।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেই নয়, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারমাণবিক নীতি ও নিরাপত্তা কৌশল পরিবর্তন করছে। পারমাণবিক অস্ত্রকে রক্ষাকবচ হিসেবে দেখার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স