প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব একটি ‘সৃজনশীল বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, দেশের সব শ্রেণির মানুষের কল্যাণ ও অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যেই এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে নিজের চেম্বারে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাময় বাজেট’
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এ বাজেট মূলত উৎপাদনবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং ব্যবসাবান্ধব। এ বাজেটে যে ছাড় ও রেয়াত দেওয়া হয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। এর ফলে অর্থনীতি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সচল হবে এবং আমরা আশা করি, বাংলাদেশের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাঁড়াবে।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও অগোছালো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে দেশকে পুনর্গঠনের যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেট সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
‘সৃজনশীল ও যুগান্তকারী বাজেট’
বাজেটকে ‘যুগান্তকারী’ এবং ‘সম্পূর্ণ সৃজনশীল’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপি মহাসচিব। তার ভাষায়, বাজেটে এমন কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগে কখনো বাস্তবায়ন হয়নি বা চিন্তায়ও আসেনি।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবারপ্রধান নারীর হাতে কার্ড তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান। এ খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিখাতে জোর
মির্জা ফখরুল বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাতের উন্নয়নে বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক কৃষককে নির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া খাল খনন, পানি সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মৎস্য চাষে বিশেষ উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগকে তিনি সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন।
শিল্প ও বিনিয়োগে প্রণোদনা
দেশীয় শিল্প ও উৎপাদন খাতের সুরক্ষায় বাজেটে উল্লেখযোগ্য করছাড় ও প্রণোদনার কথা তুলে ধরেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে স্থানীয় শিল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, এসব উদ্যোগ দেশীয় উৎপাদন বাড়াবে এবং বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও অনুকূল করবে।
এসএমই ও কর্মসংস্থান খাতে গুরুত্ব
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ, প্রবাসী কার্ড কার্যক্রম এবং হাইটেক পার্কে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, এসব উদ্যোগ তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি
তিনি জানান, প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ১ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এই দুই খাতে গুণগত পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
রাজস্ব ও কর ব্যবস্থায় সংস্কার
অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক হিসেবে কর প্রশাসন ও রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, কর প্রদানে হয়রানি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কাস্টমস ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, করদাতা বৃদ্ধির জন্য জনবান্ধব কর প্রশাসন গড়ে তোলা হচ্ছে এবং রপ্তানি সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে কাস্টমস বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আশাবাদ
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে স্বাভাবিকভাবেই বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে এবং মূল্যস্ফীতি কমে যাবে।
তার ভাষায়, “এই বাজেট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।”
সামগ্রিক মূল্যায়ন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের একটি বাস্তবসম্মত রূপরেখা। তার মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এই বাজেট দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।