দেশে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির বিস্তৃত তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১১টি অর্থ পাচার মামলা বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বুধবার জাতীয় সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষণা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, পূর্ববর্তী সরকার আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের কাজ চলছে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, এ বিষয়টি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
১১ মামলা অগ্রাধিকারে
সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে ১১টি অগ্রাধিকারভুক্ত অর্থ পাচার মামলা চিহ্নিত করেছে।
এই তালিকায় রয়েছে—
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী
এস আলম গ্রুপ
বেক্সিমকো গ্রুপ
সিকদার গ্রুপ
বসুন্ধরা গ্রুপ
নাসা গ্রুপ
ওরিয়ন গ্রুপ
নাবিল গ্রুপ
এইচ বি এম ইকবাল ও তাঁর পরিবার
সামিট গ্রুপ
সরকার জানায়, এসব মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিদেশে অর্থ ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত ১০টি দেশের সঙ্গে সরকার যোগাযোগ করছে। দেশগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং।
এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্মতি পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। বাকি সাত দেশের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও ফেরাতে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (MLA) কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
২৩৪ বিলিয়ন ডলারের পাচার অনুমান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে। গড়ে বছরে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকার সমান।
তিনি বলেন, এই অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় তা উদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারে অগ্রাধিকার: অর্থ পুনরুদ্ধার
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং আইনি সহায়তা প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে।
সংসদে অন্য প্রশ্নের জবাব
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে এক হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফ্রিল্যান্সার তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে ২০ লাখ ফ্রিল্যান্সার কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে সাড়ে সাত হাজার কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে উত্থাপিত এই ঘোষণা বর্তমান সরকারের দুর্নীতি দমন ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনের একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিদেশে অর্থ ফেরত আনা এবং শ্বেতপত্র প্রকাশ—দুটি বিষয়ই আগামী দিনে সরকারের নীতিগত অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।