আজ ২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বই দিবস—যা ‘বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস’ নামেও পরিচিত। বইপড়া, প্রকাশনা ও কপিরাইট সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর এ দিনটি পালন করে ইউনেসকো। ১৯৯৫ সালে প্যারিসে সংস্থাটির সাধারণ অধিবেশনে দিনটি উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দিনটি নির্বাচনের পেছনে রয়েছে সাহিত্যজগতের তিন কিংবদন্তি—উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, মিগেল দে থের্ভান্তেস ও ইনকা গার্সিলাসো দে ভেগা—যাঁদের প্রয়াণদিবস ২৩ এপ্রিল।
বিশ্ব বই দিবস শুধু বইয়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় না, বরং সেই সব স্থানকেও উদ্যাপন করে যেখানে জ্ঞান, ইতিহাস ও কল্পনার ভান্ডার সংরক্ষিত—লাইব্রেরি। ডিজিটাল যুগে ই–বুকের জনপ্রিয়তা বাড়লেও, শতাব্দীপ্রাচীন বা আধুনিক নান্দনিক লাইব্রেরিতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা এখনও অনন্য। স্থাপত্য, ইতিহাস ও সাহিত্যের এক মেলবন্ধন হিসেবে বিশ্বের কিছু লাইব্রেরি আজও বিস্ময় জাগায়।
নিচে বিশ্বের ১০টি দৃষ্টিনন্দন লাইব্রেরির ভেতরের গল্প তুলে ধরা হলো—
১. ট্রিনিটি কলেজ লাইব্রেরি, আয়ারল্যান্ড
ডাবলিনের এই লাইব্রেরির ‘লং রুম’ বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। উঁচু কাঠের বুকশেলফ, খিলানাকৃতির ছাদ এবং দুই লাখের বেশি প্রাচীন বই এটিকে এক অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে। এখানেই সংরক্ষিত আছে বিখ্যাত বুক অব কেলস।
২. অ্যাডমন্ট অ্যাবি লাইব্রেরি, অস্ট্রিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মঠ-লাইব্রেরিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। সাদা-সোনালি বারোক স্থাপত্য, অলংকৃত ছাদচিত্র এবং প্রাকৃতিক আলো মিলিয়ে এর ভেতরটা যেন স্বর্গীয় আবহ তৈরি করে।
৩. বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিনা, মিসর
প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির আধুনিক প্রতিরূপ। বিশাল ঢালু ছাদ ও প্রশস্ত পাঠকক্ষ এই স্থাপনাকে ইতিহাস ও আধুনিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণে পরিণত করেছে।
৪. স্ত্রাহভ মনাস্টেরি লাইব্রেরি, চেক প্রজাতন্ত্র
অসাধারণ ছাদচিত্র, প্রাচীন গ্লোব এবং শতাব্দীপ্রাচীন পাণ্ডুলিপির জন্য বিখ্যাত। থিওলজিক্যাল ও ফিলোসফিক্যাল হল এর প্রধান আকর্ষণ।
৫. জর্জ পিবডি লাইব্রেরি, যুক্তরাষ্ট্র
‘ক্যাথেড্রাল অব বুকস’ নামে পরিচিত। পাঁচতলা উঁচু ঢালাই লোহার বারান্দা ও স্কাইলাইটের আলো এক নাটকীয় সৌন্দর্য তৈরি করে।
৬. স্টুটগার্ট সিটি লাইব্রেরি, জার্মানি
মিনিমালিস্ট ও আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। সাদা, কিউবিক নকশা এবং উন্মুক্ত বিন্যাস এক ভিন্নধর্মী পাঠপরিবেশ তৈরি করেছে।
৭. রয়্যাল পর্তুগিজ ক্যাবিনেট অব রিডিং, ব্রাজিল
নিও-ম্যানুয়েলাইন স্থাপত্যে নির্মিত এই লাইব্রেরির কাঠের কারুকাজ ও রঙিন কাচের স্কাইলাইট এক রাজকীয় আবহ সৃষ্টি করে।
৮. তিয়ানজিন বিনহাই লাইব্রেরি, চীন
ঢেউয়ের মতো বুকশেলফ ও বিশাল গোলাকার অডিটোরিয়াম একে ভবিষ্যৎমুখী স্থাপত্যের প্রতীক বানিয়েছে। এটি যেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনির দৃশ্য।
৯. লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বের বৃহত্তম লাইব্রেরিগুলোর একটি। থমাস জেফারসন ভবনের সিঁড়ি, মোজাইক ও পাঠকক্ষ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
১০. বিবলিওতেকা জোয়ানিনা, পর্তুগাল
১৮ শতকের এই লাইব্রেরি সোনালি কাঠের কাজ, আঁকা ছাদ ও প্রাচীন বইয়ের সংগ্রহে ভরপুর। বই রক্ষায় ভেতরে বাদুড় রাখার ঐতিহ্য এটিকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বই পড়ার প্রবণতা কিছুটা কমলেও, লাইব্রেরিগুলো এখনও জ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কাজের চাপ বা ব্যক্তিগত জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে অনেকের কাছেই বই হয়ে ওঠে আশ্রয়।
বিশ্ব বই দিবস তাই শুধু পাঠাভ্যাসের আহ্বানই নয়—এটি জ্ঞানের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার এক বৈশ্বিক উদ্যাপন।