ঢাকা

প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষার ফি চালুর উদ্যোগ, অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরীক্ষার খরচ বহনে সরকারি বরাদ্দ সংকটের কারণ দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ অর্থ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৪০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা করে পরীক্ষার ফি নেওয়া হবে।

তবে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষা যেখানে আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক, সেখানে পরীক্ষার মতো মৌলিক শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া অবৈতনিক শিক্ষার মূল ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বরাদ্দ সংকটে ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় পরীক্ষার ব্যয় পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ কারণে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরীক্ষার আয়োজন করতে অর্থ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আর ফি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, পরীক্ষা গ্রহণের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আপাতত এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয় পর্যায়ে মৌখিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যালয়ে মৌখিক নির্দেশনা

রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, উপজেলা বা থানা পর্যায়ে প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। সম্প্রতি এমন একটি সভায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি নেওয়ার বিষয়ে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।

ওই শিক্ষক বলেন, অতীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য সামান্য ফি নেওয়ার প্রচলন ছিল। তবে করোনার পর থেকে পরীক্ষাসহ বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের ব্যয় সরকারি বরাদ্দ থেকেই বহন করা হচ্ছিল।

বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য দেওয়া স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) ফান্ডের বরাদ্দ কমে যাওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ে আর্থিক সংকট তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্লিপ ফান্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য দেওয়া বার্ষিক আর্থিক সহায়তা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে এ অর্থ ব্যয় করা হয়।

একজন প্রধান শিক্ষক জানান, আগে কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ও বছরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেত। বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে এ বরাদ্দ কমে ১৫ হাজার টাকার মতো হয়েছে। অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা আয়োজন করতেই প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।

তিন পরীক্ষায় বাড়বে শিক্ষার্থীদের চাপ

দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণত বছরে ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক—এই তিনটি পরীক্ষা নেওয়া হয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের ও দরিদ্র পরিবারের সন্তান। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ৩০ থেকে ৫০ টাকা ফি অর্থের দিক থেকে বড় অঙ্ক না হলেও এর নীতিগত গুরুত্ব রয়েছে।

তাদের মতে, দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সামান্য অর্থও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অবৈতনিক শিক্ষার ধারণার সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

আগে ছিল আরও বিস্তৃত ফি প্রস্তাব

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষার ফি নির্ধারণের বিষয়ে অনলাইনে মতামত চেয়েছিল।

সেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ২০ টাকা করে এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য যথাক্রমে ৩০ টাকা, ৪০ টাকা ও ৫০ টাকা করে ফি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

তবে কোনো শিক্ষার্থী ফি দিতে অক্ষম হলে তার ফি মওকুফের ব্যবস্থা রাখার কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ ছিল। শেষ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি বাদ দিয়ে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অবৈতনিক শিক্ষার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক?

সরকার বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ইউনিফর্ম, জুতা ও খাবার কর্মসূচির মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চালুর উদ্যোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় পরীক্ষার ব্যয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরও কেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার মতো ব্যয় শিক্ষার্থীদের বহন করতে হবে—এ প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

দেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জনগণের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব শিশু-কিশোরকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কা

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষায় পরীক্ষার ফি আরোপ করা উচিত নয়।

তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত অবৈতনিক শিক্ষার মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াতে পারে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া এই অর্থ সরকারের সামগ্রিক ব্যয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। তাই এমন একটি মৌলিক ব্যয় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বাধা কমানোই যেখানে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সেখানে পরীক্ষার ফি চালু করা সেই লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স