আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। দেশটির সরকার স্টুডেন্ট ভিসা, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা (ELICOS) কোর্সের ভিসা এবং পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসার আবেদন ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগকর্তা-স্পনসরকৃত দক্ষ কর্মী ভিসার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বেতনসীমাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ঘোষিত নতুন ফি কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কিছু ভিসা শ্রেণিতে আবেদন ফি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এ বৃদ্ধি ২০০ শতাংশেরও বেশি। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা খাতের অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্বপরামর্শ ছাড়াই সরকার এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে।
স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি বেড়েছে
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি ২ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার করা হয়েছে। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ফি বেড়েছে ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
তবে আসিয়ান (ASEAN) সদস্যভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক কম ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি হবে ২ হাজার ৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
অন্যদিকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা (ELICOS) কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ভিসা আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসাও আরও ব্যয়বহুল
পড়াশোনা শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করার সুযোগ দিতে যে টেম্পোরারি গ্র্যাজুয়েট ভিসা (Subclass 485) দেওয়া হয়, সেটির আবেদন ফিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই ভিসার আবেদন ফি ৪ হাজার ৬০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৭৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার করা হয়েছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শেষে কর্মজীবন শুরু করতে আগ্রহী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
দক্ষ কর্মী ভিসার বেতনসীমাও বৃদ্ধি
শুধু শিক্ষার্থী ভিসাই নয়, নিয়োগকর্তা-স্পনসরকৃত দক্ষ কর্মী ভিসার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এনেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ভিসার জন্য আবেদনকারীকে বছরে ন্যূনতম ৭৯ হাজার ৪৯৯ অস্ট্রেলিয়ান ডলার বেতন পেতে হবে। আগে এই ন্যূনতম বেতনসীমা ছিল ৭৬ হাজার ৫১৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শিক্ষার্থী ভিসা
সাম্প্রতিক এই ফি বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা আবেদন ফির দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শিক্ষা গন্তব্যে পরিণত হয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার। তুলনামূলকভাবে যুক্তরাজ্যে একই ধরনের ভিসার জন্য প্রায় ৯৩৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সমপরিমাণ, নিউজিল্যান্ডে ৭৯০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৭৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার এবং কানাডায় মাত্র ২৪০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সমপরিমাণ ফি দিতে হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি বেড়েছে প্রায় ২৮৫ শতাংশ। একই সময়ে পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসার আবেদন ফি বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪৮ শতাংশ।
শিক্ষা খাতের উদ্বেগ
হঠাৎ করে ভিসা ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা খাতের বিভিন্ন সংগঠন।
ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার (IEAA) প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগী দেশগুলো লাভবান হতে পারে। তাঁর ভাষায়, কোনো ধরনের পরামর্শ বা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুযোগ না দিয়েই রাতারাতি সব ধরনের ভিসা ফি বাড়ানো হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিকল্প শিক্ষা গন্তব্য হিসেবে অন্যান্য দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর জন্য সুবিধাজনক হবে।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে ইনডিপেনডেন্ট হায়ার এডুকেশন অস্ট্রেলিয়াও। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী পিটার হেন্ডির মতে, ভিসা ফির এই বড় ধরনের বৃদ্ধি অস্ট্রেলিয়াকে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।