ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে হামাস। প্রায় দুই দশক ধরে গাজার শাসনভার পরিচালনা করা সশস্ত্র সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে গাজা পরিচালনার উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে।
সোমবার (৬ জুলাই) হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত চলমান যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার অংশ কি না কিংবা গাজায় দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট নিরসনে তা কী ধরনের বাস্তব প্রভাব ফেলবে—সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়ার প্রস্তুতির ঘোষণা
হামাসের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংগঠনটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি বিকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরে প্রস্তুত রয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দাবির বিপরীতে হামাস একতরফাভাবে নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয়নি।
বিবৃতিতে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হলেও ঠিক কবে, কী প্রক্রিয়ায় কিংবা কোন শর্তে এই ক্ষমতা হস্তান্তর হবে—সে বিষয়ে কোনো সময়সূচি বা বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
যে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কথা বলছে হামাস
হামাস যে প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলেছে, সেটি গাজা প্রশাসনবিষয়ক জাতীয় কমিটি (National Committee for Gaza Administration–NCGA) নামে পরিচিত।
এই অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামোটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা, মানবিক সহায়তা সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো তৈরি করা।
হামাসের সাম্প্রতিক ঘোষণাকে সেই উদ্যোগের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন সম্ভাবনা?
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, হামাসের এই অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির পরিবর্তন না আনলেও রাজনৈতিক দিক থেকে এর প্রতীকী গুরুত্ব অনেক।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রচেষ্টায় এটি নতুন গতি আনতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় প্রশাসনিক পুনর্গঠন, পুনর্বাসন কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি হামাস বাস্তবিক অর্থে প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গাজায় পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রায় ২১ লাখ অবরুদ্ধ মানুষের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পথ কিছুটা সহজ হতে পারে।
দীর্ঘ যুদ্ধ, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সংঘাতে গাজার অবকাঠামোর ৯০ শতাংশেরও বেশি ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। টানা হামলা ও স্থল অভিযানে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং উপত্যকার অধিকাংশ মানুষ খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও আশ্রয়ের তীব্র সংকটে জীবনযাপন করছেন।
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ এখনো অনিশ্চিত
হামাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা এখনো চূড়ান্ত সাফল্য পায়নি।
যদিও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, তবু স্থায়ী সমাধান কিংবা গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে এখনো কোনো সর্বসম্মত রাজনৈতিক সমঝোতা হয়নি।
এ অবস্থায় হামাসের প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের আগ্রহ ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। তবে এই ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না এবং গাজার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এর কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর।