ঢাকা

‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ রয়ে গেছে’—নাহিদ ইসলাম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, দেশে দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থপাচার বন্ধ করতে হলে কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন। তাঁর দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়ায় বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি ও অর্থপাচারের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাতে টাঙ্গাইল শহরের নিরালা মোড়ে এনসিপির পদযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘দুর্নীতি ও অর্থপাচার দেশের প্রধান সংকট’

নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, লুটপাট এবং বিদেশে অর্থপাচার।

তিনি বলেন, “আপনাদের কি মনে হয়, এই সরকারের সময়ে কোনো দুর্নীতি, লুটপাট বা টাকা পাচার হবে না? অবশ্যই হবে। কারণ, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে নাই।”

তার ভাষ্য, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে না পারলে একই ধরনের সমস্যা পুনরায় ফিরে আসবে।

‘পাচার হওয়া অর্থ দেশে থাকলে বড় উন্নয়ন সম্ভব ছিল’

অর্থপাচারের প্রসঙ্গ তুলে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, সেই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করা গেলে নিজেদের অর্থায়নেই একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশ থেকে কয়েক শ বিলিয়ন টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই অর্থ দেশে থাকলে আমরা নিজেদের টাকায় আরও কয়েকটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পারতাম, একাধিক মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারতাম। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তোলাও সম্ভব হতো।”

‘আমাদের আন্দোলন শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য ছিল না’

দেশব্যাপী এনসিপির পদযাত্রা কর্মসূচির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

তিনি বলেন, একসময় অনেকে মনে করতেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণে সেই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, “যারা জীবন দিয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, হাজারো জুলাই যোদ্ধার আত্মত্যাগ তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। আমরা শুরু থেকেই বলেছি, আমাদের আন্দোলন শুধু আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও দেশ পরিবর্তনের আন্দোলন। সেই লক্ষ্যেই আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে জনগণের কাছে এসেছি।”

‘সংস্কারের পক্ষে জনগণের স্পষ্ট জনসমর্থন রয়েছে’

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা তুলে ধরে এনসিপির আহ্বায়ক দাবি করেন, সাম্প্রতিক গণভোটে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন।

তার ভাষ্য, “নির্বাচনে আমরা সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছি। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ এই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। অথচ যারা সরকার গঠন করেছে, তারা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ সরকারের চেয়ে সংস্কারের পক্ষে জনসমর্থন বেশি।”

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণের সেই রায় বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার এখনো গণভোটের রায় এবং জুলাই সনদের আলোকে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেনি। তার মতে, সংস্কার ছাড়া দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

‘জনগণের কাছ থেকেই বাস্তব চিত্র জানতে চাই’

সমাবেশে বক্তব্য দেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও শীর্ষ নেতার বক্তব্য শুনলে মনে হয় দেশে আর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি জানতেই এনসিপি জনগণের কাছে এসেছে।

তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের কাছ থেকে জনরায় নিতে এসেছি। কারণ, সাধারণ মানুষই বাংলাদেশ। এখন জনগণই বলবে, বাস্তবে সমস্যাগুলো আছে কি নেই।”

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

বক্তব্যের একপর্যায়ে সারজিস আলম টাঙ্গাইলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন।

তিনি জানতে চান, টাঙ্গাইলে নিয়মিত লোডশেডিং হয় কি না এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না।

এ সময় জনতার মধ্যে থেকে একজন বলেন, এলাকায় নিয়মিত বিদ্যুৎই আসে না। সেই মন্তব্যের সূত্র ধরে সারজিস আলম বলেন, “যদি ঠিকমতো বিদ্যুৎই না আসে, তাহলে বিদ্যুৎ যাওয়ার প্রশ্নই বা আসে কীভাবে?”

স্থানীয় নেতাদের বক্তব্য

পথসভায় আরও বক্তব্য দেন এনসিপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দার, টাঙ্গাইল জেলা শাখার আহ্বায়ক কামরুজ্জামান শাওন, সদস্যসচিব মাসুদুর রহমানসহ স্থানীয় নেতারা।

বক্তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা দলীয় পদযাত্রা কর্মসূচিকে জনগণের মতামত সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার একটি অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স