ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে দেশটির ধর্মীয় নগরী কোমে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। রাজধানী তেহরানে টানা তিন দিন ধরে জানাজা ও শোকানুষ্ঠান শেষে মঙ্গলবার তাঁর মরদেহ কোমে নেওয়া হয়, যেখানে বিপুলসংখ্যক শোকাহত মানুষ শেষশ্রদ্ধা জানান।
আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কোমে ছিল গভীর শোকের আবহ। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা মানুষ তাঁদের দীর্ঘদিনের নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে শোকমিছিলে অংশ নেন।
হেলিকপ্টারে কোমে পৌঁছায় মরদেহ
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, রাজধানী তেহরানের দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরে আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ বহনকারী একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করছে।
সেখানে আগে থেকেই লাখো মানুষ শেষশ্রদ্ধা জানানোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মরদেহ পৌঁছানোর পর শোকমিছিল ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তাঁকে বিদায় জানান উপস্থিত জনতা।
তেহরানে টানা তিন দিনের শোক
কোমে নেওয়ার আগে রাজধানী তেহরানে টানা তৃতীয় দিনের মতো খামেনির জানাজা ও বিদায় অনুষ্ঠানে বিপুল মানুষের সমাগম হয়।
শহরের প্রধান প্রধান সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ রাজধানীতে এসে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ১৯৮৯ সালে ইরানের বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর দেশটিতে এত বড় জনসমাগম আর দেখা যায়নি।
শোকাহত মানুষের আবেগ
শোকমিছিলে অংশ নেওয়া হামিদ নামের এক ব্যক্তি আল–জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে বিভক্ত করা। তবে তাঁর দাবি, খামেনি সেই বিভাজনের চেষ্টা প্রতিহত করেছিলেন।
তিনি বলেন,
“ইরানবাসী তাঁর সেই অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এখানে এসেছেন।”
আরেক শোকাহত নারী মারজিয়াহ বলেন, তিনি তাঁর নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে শোকানুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন।
তাঁর ভাষায়,
“আমরা আমাদের শহীদ নেতাকে বলতে এসেছি, তাঁর রক্ত বৃথা যাবে না। আমরা তাঁর প্রতি আমাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করতে এখানে এসেছি।”
অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি
খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে তাঁর অন্য তিন ছেলে উপস্থিত থাকলেও নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মোজতবা খামেনিকে কোথাও দেখা যায়নি।
ইরানের সরকারি সূত্র অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনিকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
একই হামলায় তিনিও আহত হন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসেননি। এমনকি বাবার জানাজা ও শেষবিদায়ের অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
নিরাপত্তা কারণেই অনুপস্থিতি
তেহরান ইউনিভার্সিটির গবেষক মোহাম্মদ এসলামির মতে, চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণেই মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে আসতে পারেননি।
তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সর্বোচ্চ নেতার প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়া বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে মোজতবার পক্ষে শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না।
বৃহস্পতিবার মাশহাদে দাফন
ইরানের সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর–পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদে, যা আয়াতুল্লাহ খামেনির জন্মস্থান, সেখানে তাঁকে দাফন করা হবে।
দাফনের আগে কোমে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও সাধারণ মানুষের শেষশ্রদ্ধা গ্রহণের কার্যক্রম চলবে।
জাতীয় শোক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর শেষযাত্রায় বিপুল জনসমাগম একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় শোকের প্রতিফলন, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থনের বার্তাও বহন করছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
তবে একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।