ঢাকা

ভিডিও প্রকাশের জেরে স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় তদন্তে ইসরায়েলি পুলিশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
অধিকৃত পশ্চিম তীরের কালান্দিয়া শরণার্থীশিবিরে অভিযানের সময় ফিলিস্তিনিদের বহনকারী একটি গাড়িতে একজন ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশ সদস্যের স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপের অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঘটনাটির সিসিটিভি ভিডিও প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেম প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযানের সময় গাড়িতে স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ

প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কালান্দিয়া শরণার্থীশিবিরে অভিযান পরিচালনার সময় এক ইসরায়েলি সীমান্ত পুলিশ কর্মকর্তা একটি গাড়ির কাছে এগিয়ে যান। গাড়িটিতে কয়েকজন ফিলিস্তিনি তরুণ অবস্থান করছিলেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ কর্মকর্তা গাড়ির ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে উচ্চস্বরে কথা বলেন। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি শুরু হয়।

এরপর ওই কর্মকর্তা তাঁর কোমরে থাকা সরঞ্জাম থেকে একটি স্টান গ্রেনেড বের করে গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ছুড়ে দেন।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, গ্রেনেড নিক্ষেপের পর চালক গাড়ি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কর্মকর্তা দরজাটি জোরপূর্বক বন্ধ করে দেন। এ সময় তাঁকে উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায়, “মুখ বন্ধ রাখো। কার সঙ্গে এভাবে কথা বলছ।”

কয়েক সেকেন্ড পর গাড়ির ভেতরে স্টান গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হলে ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে যায়। পরে গাড়ির বিপরীত পাশের দরজা দিয়ে অন্তত দুজন যাত্রী দ্রুত বেরিয়ে আসেন।

মানবাধিকার সংস্থা বি’ৎসেলেম জানিয়েছে, গাড়িতে থাকা সবাই ওই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেছেন।

ভিডিও প্রকাশের পর তদন্ত

ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

এরপর এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি পুলিশ জানায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তার আচরণ ‘নিয়মবহির্ভূত’ ছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীন পুলিশ কর্মকর্তাদের তদন্ত বিভাগ ঘটনাটি তদন্ত করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

স্টান গ্রেনেড কী?

স্টান গ্রেনেড বা ফ্ল্যাশব্যাং এমন একটি বিশেষ ধরনের বিস্ফোরক, যা প্রাণঘাতী অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং মানুষকে সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত বা অক্ষম করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

এটি বিস্ফোরণের সময় অত্যন্ত তীব্র আলোর ঝলকানি ও উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টি করে। নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণত অভিযান পরিচালনার সময় এটি ব্যবহার করে থাকে।

তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব কাছ থেকে বা সীমিত জায়গার ভেতরে স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলে গুরুতর শারীরিক আঘাত, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির ক্ষতি কিংবা দগ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে।

একই অভিযানে কিশোর নিহতের অভিযোগ

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কালান্দিয়া শরণার্থীশিবিরে একই অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ওয়ালিদ আবু স্নেনেহ নামে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের দাবি, এ ঘটনায় আরও তিনজন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে শরীরের নিচের অংশে আঘাত পেয়েছে অন্তত দুই ফিলিস্তিনি শিশু।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।

মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা অভিযান, গ্রেপ্তার, সংঘর্ষ এবং বেসামরিক হতাহতের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ১৭৫ জন বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই শিশু।

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বা অভিযোগ গঠন করা হয়নি।

তদন্তের দিকে নজর আন্তর্জাতিক মহলের

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, কালান্দিয়া শরণার্থীশিবিরে স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপের ভিডিওটি নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভিডিওতে দেখা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স