ঢাকা

১৮০ সেকেন্ডে গবেষণা উপস্থাপন, বাস্তব সমস্যার সমাধানে শিক্ষার্থীদের অভিনব উদ্যোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মাত্র ১৮০ সেকেন্ড। এই অল্প সময়েই জটিল গবেষণাকে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে হয়েছে প্রতিযোগীদের। আর সেই তিন মিনিটেই উঠে এসেছে ডেঙ্গুর আগাম পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ কমানোর উপায়, স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, ব্লকচেইনভিত্তিক নিরাপদ অভিবাসন ব্যবস্থা এবং দুর্যোগে ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের মতো সময়োপযোগী নানা গবেষণা ও উদ্ভাবনী ধারণা।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন উৎসব ‘সাইব্লিটজ ২.০’-এর দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক মানের ‘থ্রি মিনিট থিসিস (3MT)’ প্রতিযোগিতা। আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁদের গবেষণার মূল বিষয় মাত্র তিন মিনিটে উপস্থাপন করেন।

তিন মিনিটে ডেঙ্গুর আগাম পূর্বাভাসের গবেষণা

প্রতিযোগিতার অন্যতম আলোচিত উপস্থাপনা ছিল বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তীব্র পালের গবেষণা। বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বাস্তবতাকে সামনে রেখে তিনি এমন একটি গবেষণার ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা এবং জলাবদ্ধতার তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো এলাকায় ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

তাঁর মতে, এ ধরনের পূর্বাভাস ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে। একই সঙ্গে জনগণও সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাবে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই বাস্তব সমস্যাভিত্তিক এই গবেষণা উপস্থিত দর্শক ও বিচারকদের আগ্রহ কাড়ে।

জটিল গবেষণাকে সহজ ভাষায় তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ‘থ্রি মিনিট থিসিস’ প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিযোগীদের হাতে ছিল মাত্র তিন মিনিট সময়। পুরো গবেষণাপত্র নয়, বরং গবেষণার সমস্যা, পদ্ধতি, ফলাফল এবং সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব একটি মাত্র স্থির ছবি বা পোস্টারের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।

ভিডিও, অ্যানিমেশন কিংবা একাধিক স্লাইড ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। ফলে গবেষণার গভীরতা অক্ষুণ্ন রেখে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তা উপস্থাপন করার দক্ষতাই ছিল প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এআইয়ের ভুল তথ্য কমানোর উপায় নিয়ে গবেষণা

প্রতিযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও ছিল একাধিক গবেষণা। একটি দল এআইয়ের ‘হ্যালুসিনেশন’, অর্থাৎ বাস্তবতার সঙ্গে অসংগত বা ভুল তথ্য তৈরির প্রবণতা কমানোর উপায় নিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করে।

গবেষকরা প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, উন্নত ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা (Prompt Engineering) ব্যবহার করলে এআইয়ের ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

এ ছাড়া আরেকটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম্পিউটার প্রসেসরের গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্যসেবায় স্মার্ট প্রযুক্তির নতুন ভাবনা

স্বাস্থ্যসেবা খাতেও শিক্ষার্থীদের বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনী ধারণা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

এর মধ্যে ছিল মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিভিত্তিক স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারে।

এ ছাড়া সেলফ-হিলিং উপাদান, ব্লকচেইনভিত্তিক নিরাপদ অভিবাসন প্ল্যাটফর্ম ‘সেইফপাস’, এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ড্রোনের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণব্যবস্থা নিয়েও গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।

প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনা

প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজন করা হয় একটি বিশেষ স্পিকার সেশন। সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বক্তাদের মধ্যে ছিলেন আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (কোর অপারেশনস) মো. আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান।

প্রথম দিনজুড়ে হ্যাকাথন, স্টেম বি ও প্রজেক্ট শোকেস

উৎসবের প্রথম দিন সকাল থেকেই শুরু হয় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান তৈরি করেন অংশগ্রহণকারীরা। স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা ও জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতের সমস্যা সমাধানে তাঁরা নিজস্ব ধারণা উপস্থাপন করেন।

একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় স্টেমভিত্তিক বানান প্রতিযোগিতা ‘স্টেম বি’। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে জটিল পরিভাষার বানান, উচ্চারণ এবং সংশ্লিষ্ট ধারণা যাচাইয়ের এই প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।

এ ছাড়া প্রজেক্ট শোকেস ছিল উৎসবের আরেকটি আকর্ষণ। সারিবদ্ধভাবে সাজানো বিভিন্ন স্টলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি প্রকল্প প্রদর্শন করেন। কোথাও সেন্সরনির্ভর প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা, কোথাও শেষ মুহূর্তের কোডিং—সব মিলিয়ে প্রযুক্তিপ্রেমী শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। বিচারকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন।

ক্যারিয়ার উন্নয়ন নিয়ে বিশেষ সেশন

দুপুরে অনুষ্ঠিত হয় পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সেশন ‘এসপিএএক্স’। এতে প্রযুক্তি খাতের বর্তমান চাহিদা, কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন সিমেন্স বাংলাদেশের আঞ্চলিক প্রধান ইরফান বিন আমদাদ চৌধুরী এবং ব্র্যাক আইটি সার্ভিসেসের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মো. মিনহাজুল আবেদীন।

বিজয়ীদের নাম ঘোষণা

দুই দিনের আয়োজন শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।

থ্রি মিনিট থিসিস (3MT): চ্যাম্পিয়ন টিম এম্বার, রানারআপ টিম জায়রিজ।
হ্যাকাথন: চ্যাম্পিয়ন টিম ফৌরমাইন্ডস, রানারআপ টিম সাস।
প্রজেক্ট শোকেস: চ্যাম্পিয়ন সিনক রোবোটিকস, রানারআপ টিম জিরো নেক্সট জেন।
৫২ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেন।

আয়োজনে অংশ নেওয়া আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ফয়সাল মাহমুদ বলেন, “এখানে অংশ নিয়ে বেশ ভালো লাগছে। আয়োজনটিও বেশ গোছানো ছিল।”

আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সভাপতি মো. ইনজামাম উল হক সিয়াম বলেন, “গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। শুধু শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নয়, গবেষণার ধারণা আছে—এমন সব শিক্ষার্থীকেই এখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।”

উল্লেখ্য, দুই দিনব্যাপী এই প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন উৎসবের টাইটেল স্পনসর ছিল শীস্টেম, গোল্ড স্পনসর মেঘনা গ্রুপ, আর সহযোগী হিসেবে ছিল প্রথম আলো। প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান বিনিময়ের সমন্বয়ে ‘সাইব্লিটজ ২.০’ দেশের তরুণ গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স