সরকারি কলেজে কর্মরত ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে (ডেমনস্ট্রেটর) বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রভাষক পদে পদোন্নতি ও দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে পদায়নের সরকারি সিদ্ধান্ত শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকার বলছে, বিদ্যমান আইনি বিধান অনুসারেই এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা ক্যাডারের একটি অংশের অভিযোগ, এ ধরনের পদোন্নতি বিসিএসের মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা, সমান সুযোগের নীতি এবং প্রশাসনিক ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত ২০ জুলাই প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীন সরকারি কলেজে কর্মরত দশম গ্রেডের ১৪৫ জন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শককে নবম গ্রেডে উন্নীত করে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রভাষক হিসেবে পদোন্নতি ও পদায়নের আদেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি শিক্ষা ক্যাডার, প্রশাসন এবং চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আইনি ভিত্তি থাকলেও প্রশ্ন নীতিগত
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদোন্নতির আইনি ভিত্তি রয়েছে। ২০১৫ সালে জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস, ১৯৮১ সংশোধন করে বিজ্ঞান বিষয়ের প্রদর্শকদের জন্য ক্যাডারে পদোন্নতির কোটা ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এর আগে এই হার ছিল ২ শতাংশ।
ফলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রদর্শকদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতির সুযোগ পান। তবে সমালোচকদের মতে, আইনগত বৈধতা থাকলেও এটি প্রশাসনিক ন্যায়সংগততা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগনীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘পদোন্নতির অধিকার নয়, বিতর্ক ক্যাডারে প্রবেশপথ নিয়ে’
শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, প্রদর্শকদের পদোন্নতির অধিকার নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর উচ্চতর পদে উন্নীত হওয়া প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে তাঁদের প্রশ্ন, সেই পদোন্নতির গন্তব্য সরাসরি বিসিএস ক্যাডার হওয়া কতটা যৌক্তিক।
কারণ, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রবেশের জন্য প্রতিবছর লাখো শিক্ষার্থী দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষাসহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করে অল্পসংখ্যক প্রার্থী ক্যাডার পদে নিয়োগ পান।
সমালোচকদের মতে, একই ক্যাডারে যদি ভিন্ন একটি প্রশাসনিক পথেও প্রবেশের সুযোগ থাকে, তাহলে বিসিএসের মৌলিক দর্শন—উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা, সমান সুযোগ এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচন—প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
‘একই গন্তব্যে দুই পথ’ নিয়ে বিতর্ক
বিশ্লেষকদের মতে, বিসিএস শুধু একটি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি নীতিগত অবস্থান, যেখানে যোগ্যতা নির্ধারণে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই কারণে একই ক্যাডারে একাধিক প্রবেশপথ তৈরি হলে তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সীমা ছাড়িয়ে ন্যায়বিচার, সমতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার বিষয় হয়ে ওঠে।
তাঁদের ভাষ্য, রাষ্ট্র প্রতিটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে না, বরং একটি মূল্যবোধও প্রতিষ্ঠা করে। সেই মূল্যবোধের সঙ্গে যদি বাস্তব প্রয়োগের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিসিএস পরীক্ষার্থীদের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা
বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষায় কয়েক লাখ প্রার্থী অংশ নেন। অনেকেই একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও সীমিত শূন্যপদের কারণে ক্যাডার কিংবা নন-ক্যাডার কোনো চাকরিই পান না।
এমন বাস্তবতায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একযোগে শতাধিক কর্মকর্তাকে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অনেকের কাছে কেবল পদোন্নতির বিষয় নয়; বরং সমান সুযোগের নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্ন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজধানীর নামী কলেজে প্রথম পদায়ন নিয়ে ক্ষোভ
এই পদোন্নতির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো পদায়ন।
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সাধারণভাবে বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত নবীন প্রভাষকদের কর্মজীবনের শুরু হয় দেশের প্রত্যন্ত উপজেলার সরকারি কলেজে। রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের ঐতিহ্যবাহী কলেজে বদলি পেতে তাঁদের অনেক সময় এক দশক বা তারও বেশি অপেক্ষা করতে হয়।
কিন্তু সদ্য পদোন্নতি পাওয়া অনেক কর্মকর্তার প্রথম পদায়নই হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের স্বনামধন্য সরকারি কলেজগুলোতে।
উদাহরণ হিসেবে পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৩০ জন পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদায়নের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজ ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পেয়েছেন।
এ নিয়ে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলছেন, যেখানে ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের বহু কর্মকর্তা এখনও কাঙ্ক্ষিত বদলি বা পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন, সেখানে নতুনভাবে ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত কর্মকর্তাদের এমন পদায়নের যৌক্তিকতা কী।
প্রশাসনিক ব্যাখ্যার দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদায়নের পেছনে প্রশাসনিক কারণ বা প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তবে সেটি প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা না করায় একই সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
তাঁরা বলছেন, প্রশাসনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে অনেক বিতর্কেরই অবসান ঘটতে পারে।
‘প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা’ নিয়ে উদ্বেগ
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা (Institutional Legitimacy)। এর অর্থ, কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তি কেবল আইনি বৈধতার ওপর নির্ভর করে না; বরং জনগণ কতটা বিশ্বাস করে যে প্রতিষ্ঠানটি সবার জন্য একই নিয়ম অনুসরণ করছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচকদের মতে, যদি নাগরিকদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে একই রাষ্ট্রীয় পদে পৌঁছানোর জন্য সবার পথ সমান নয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
প্রদর্শক পদের গুরুত্ব স্বীকার করেও বিকল্প প্রস্তাব
শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি কলেজে বিজ্ঞানাগার পরিচালনায় প্রদর্শক পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁদের যথাযথ পদোন্নতি, আর্থিক সুবিধা ও প্রশাসনিক অগ্রগতির সুযোগ থাকা উচিত।
তবে তাঁদের প্রস্তাব, অন্যান্য ক্যাডারের মতো প্রদর্শকদের জন্যও আলাদা পদোন্নতির কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তাঁরা উচ্চতর গ্রেড, অধিক বেতন ও মর্যাদা পান; কিন্তু বিসিএস ক্যাডারের বাইরে থেকেই সেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
এছাড়া বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রদর্শকদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পদোন্নতির সুযোগ না থাকলেও সরকারি কলেজের প্রদর্শকদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে—এটিকেও অনেকে নীতিগত বৈষম্য হিসেবে দেখছেন।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে শঙ্কা
সমালোচকদের মতে, বর্তমানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের বহু কর্মকর্তা ১২ থেকে ১৩ বছর নবম গ্রেডেই থেকে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী পদোন্নতি ও ক্যাডারভুক্তির সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁদের অভিযোগ, পদোন্নতি ও ক্যাডারভুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হওয়ায় অনেক বিসিএস কর্মকর্তা আদালতে মামলা করতেও বাধ্য হচ্ছেন।
তাঁরা মনে করেন, রাষ্ট্রীয় সেবায় নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক, উন্মুক্ত ও সমান প্রতিযোগিতার নীতি অক্ষুণ্ন রাখা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে বিসিএস ও রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হতে পারে।
উল্লেখ্য, এই লেখাটি শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য অরিয়ন তালুকদার, আজরিন জান্নাত সেবা ও সাফিয়া জান্নাত সকাল-এর উত্থাপিত মতামত ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি। এতে উত্থাপিত মূল্যায়ন ও মতামত লেখকদের নিজস্ব।