ঢাকা

যন্তর মন্তরে অভিনব আন্দোলন, সরকারের কাছে ‘তেলাপোকাদের’ তিন দাবি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে চলমান আন্দোলনে নতুন মোড় এসেছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থানরত আন্দোলনকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়েছে, তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখবে, তবে আপাতত নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানের কর্মসূচি দেবে না। একই সঙ্গে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি।

সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল চলাকালে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর যন্তর মন্তরের ধরনামঞ্চ ভেঙে দেওয়া হলেও মঙ্গলবার ভোরেই সেখানে ফিরে আসেন আন্দোলনের নেতারা। এরপর সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির নেতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, সরকারের কাছে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যন্তর মন্তরেই অবস্থান চালিয়ে যাবেন।

‘পুলিশকে আর সুযোগ দেওয়া হবে না’

অভিজিৎ দিপকে বলেন, নতুন করে সংসদ ভবন অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হবে না। তাঁর ভাষ্য, এমন কর্মসূচি দিলে পুলিশ আবারও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার সুযোগ পাবে এবং আন্দোলনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে।

তিনি বলেন, সরকারের অনমনীয় অবস্থানের কারণেই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

“শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করা হলে এই আন্দোলনের প্রয়োজনই হতো না। কিন্তু সরকার নির্লজ্জ আচরণ করছে, আর বিজেপির নেতারা উদ্ধত।”

আহত শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা

সংঘর্ষে আহত আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন অভিজিৎ দিপকে।

তিনি লেখেন, “পুলিশি বর্বরতায় আপনারা আহত হয়েছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। দিল্লি পুলিশের অমানবিক হামলা থেকে আপনাদের রক্ষা করতে পারিনি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “২০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য দায়ী একজন শিক্ষামন্ত্রীকে রক্ষা করতেই সরকার নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের রক্তাক্ত করেছে।”

সংঘর্ষ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

সোমবারের সংঘর্ষের জন্য দিল্লি পুলিশ এবং আন্দোলনকারীরা একে অপরকে দায়ী করছে।

আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ অকারণে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, আন্দোলনকারীরাই প্রথমে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

ঘটনার পর পুলিশ পাঁচটি পৃথক এফআইআর করেছে এবং ৭০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, আন্দোলনের পেছনে বৃহত্তর কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

আহত শতাধিক, পুলিশেরও ক্ষয়ক্ষতির দাবি

দিল্লি পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে তাদের ১১৮ জন সদস্য আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে সিজেপির দাবি, শতাধিক শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং কয়েকজন গুরুতর আহত।

গোয়েন্দা ব্যর্থতার ইঙ্গিত

সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সংসদ ভবন অভিমুখে এত বড় সমাবেশ হবে—এমনটি সরকার বা পুলিশ কেউই ধারণা করতে পারেনি।

এক সরকারি কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রশাসনের ধারণা ছিল কয়েক হাজার মানুষ সমাবেশে অংশ নেবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৫০ হাজার আন্দোলনকারী রাজধানীর বিভিন্ন দিক থেকে সংসদের দিকে অগ্রসর হন।

দিল্লি পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, গত চার দশকে কোনো আন্দোলন এতটা সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্রসমাজের মধ্যে এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন বাড়ছে। পরিস্থিতির ওপর সরকার নিবিড় নজর রাখছে।

এদিকে কর্ণাটকের বিজেপি নেতা কে. সুধাকর অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

সংসদেও অচলাবস্থা

ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো সংসদেও অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী জোটের নেতারা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনার দাবি জানান।

পরে সাংবাদিকদের রাহুল বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন চলছে, অথচ প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে একটি কথাও বলেননি।

রাহুলের ভাষায়,

“দেশের শিক্ষাব্যবস্থা উইপোকার খাওয়া কাঠের মতো ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে গেছে। সবাই তা জানে। অথচ প্রধানমন্ত্রী নীরব।”

হাসপাতালে আহতদের পাশে বিরোধী নেতারা

মঙ্গলবার সকালে দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে গিয়ে আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেন সিজেপির নেতারা।

একই হাসপাতালে যান কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আতিশি, সৌরভ ভরদ্বাজ, সঞ্জয় সিংসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের নেতারা।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডাও হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন।

সরকারের কাছে তিন দফা দাবি

সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডার সঙ্গে বৈঠকে সিজেপির প্রতিনিধি দল সরকারের কাছে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরে।

দাবিগুলো হলো—

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে;
অনশনরত পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুককে নিঃশর্তভাবে হাসপাতাল থেকে মুক্তি দিতে হবে;
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর আত্মহত্যা করা ২০ শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

সিজেপির নেতাদের অভিযোগ, বৈঠকের পর সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

মোদির বার্তা

মঙ্গলবার এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতে ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

রিজিজুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেছেন,

“ভুল পথে যাওয়া সহজ, কিন্তু সঠিক পথে থাকা কঠিন। শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাই আমাদের দায়িত্ব।”

এদিকে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে দাবিগুলোর বিষয়ে সন্তোষজনক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স