ঢাকা

নির্বাচনী যোগ্যতায় পরিবর্তনের প্রস্তাব, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা হতে পারেন অযোগ্য

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, সে লক্ষ্যে আইন সংশোধনের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের স্পষ্ট আইনি ভিত্তি রাখার প্রস্তাব দিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।

মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধি সংশোধনের সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।

তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশগুলো এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। তবে এগুলো কার্যকর হবে কি না, তা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। সরকার সম্মতি দিলে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং পরে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে জাতীয় সংসদে বিল পাস করতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের আইনি ভিত্তি চায় ইসি

নির্বাচন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হলো, স্থানীয় সরকারের সব ধরনের নির্বাচনে প্রয়োজন হলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সুস্পষ্ট আইনি সুযোগ রাখা।

ইসি সচিব জানান, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন আইনে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’–এর সংজ্ঞার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা আইনে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগের উল্লেখ থাকলেও উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন আইনে এ ধরনের স্পষ্ট বিধান নেই।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, আইনেই সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে নির্বাচনের সময় আলাদা প্রশাসনিক আদেশ ছাড়াই সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।

এ ছাড়া দায়িত্ব পালনকালে সেনাসদস্যরা পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বাতিলের প্রস্তাব

স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে আরেকটি বড় পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, কমিশনের অভিমত হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য হবেন না।

বর্তমান আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই।

নতুন সুপারিশ অনুযায়ী, তাঁদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

যদিও নির্বাচন কমিশন এ সিদ্ধান্তের পক্ষে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে আইন সংশোধন হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আর থাকবে না।

দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান

দ্বৈত নাগরিকত্বধারীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে নির্বাচন কমিশন।

বর্তমানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

ইসি প্রস্তাব করেছে, ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সদস্য পদ ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্য সব নির্বাচিত পদে দ্বৈত নাগরিকরা প্রার্থী হতে পারবেন না।

ঋণখেলাপি ও বিল বকেয়া থাকলেও অযোগ্যতার প্রস্তাব

বৈঠকে নির্বাচনে প্রার্থিতার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সম্পর্কেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইসি সচিব জানান, ঋণের জামিনদার হয়েও যদি ঋণ খেলাপির দায় তৈরি হয়, তবে তাকেও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে কমিশন নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ, ওয়াসা, ভূমি করসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের বিল বকেয়া থাকলেও সেটিকে নির্বাচনে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হবে।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের বকেয়া বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

পাশাপাশি লাভজনক পদে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না বলেও সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশাসক পদে থেকে নির্বাচন নয়

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনরত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে আগে পদত্যাগ করতে হবে।

অর্থাৎ দায়িত্বে বহাল থেকে নির্বাচন করার সুযোগ থাকবে না।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) যাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গৃহীত হয়েছে, তাঁদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করবে নির্বাচন কমিশন।

এনআইডি ব্যবস্থায়ও আসছে পরিবর্তনের প্রস্তাব

মঙ্গলবারের বৈঠকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)–সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ও আলোচনা হয়।

ইসি সচিব জানান, ভবিষ্যতে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন অনলাইনে করা যাবে।

এ জন্য একটি সংশোধনী ফি নির্ধারণ করা হবে, যা পরে চূড়ান্ত করা হবে।

বর্তমান আইনে প্রতি ১৫ বছর পর জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়নের বিধান রয়েছে।

এ বিষয়ে কমিশনের আলোচনার কথা জানিয়ে আখতার আহমেদ বলেন, নবায়নের সময় একটি নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে, যেখানে আবেদনকারীর পরিবারের তথ্য বা ফ্যামিলি ট্রি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতা বজায় রাখা সহজ হবে বলে কমিশনের ধারণা।

১৬ বছরের আগেই তথ্য সংগ্রহের চিন্তা

বর্তমানে ১৬ বছর বয়স পূর্ণ হলে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়।

তবে ভবিষ্যতে এ তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও আগে শুরু করা যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনা করছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি সচিব জানান, এসএসসি, অষ্টম শ্রেণি কিংবা প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় থেকেই তথ্য সংগ্রহ শুরু করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে আরও পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন

স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ও বিধি সংশোধনের বিষয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ, নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচন কমিশনের সুপারিশগুলো এখন সরকারের বিবেচনার জন্য পাঠানো হবে। সরকার সেগুলো গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সংসদের অনুমোদনের পরই নতুন বিধান কার্যকর হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স