ঢাকা

মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আটক রাহুল-প্রিয়াঙ্কা, পরে মুক্ত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে নজিরবিহীন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী, সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা মঙ্গলবার বিকেলে আকস্মিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান নিলে কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাঁদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়।

অভিযানের সময় রাহুল গান্ধীকে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে তাঁকে ও অন্য নেতাদের আটক করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর রাহুল গান্ধী এবং পরে রাতের দিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকেও মুক্তি দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ভারতের চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে ঘিরে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

শিক্ষার্থী নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান

প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে কয়েক মাস ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলছে।

গত সোমবার শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিল করলে দিল্লি পুলিশ তাদের বাধা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার প্রথমে কংগ্রেস নেতারা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠক করে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার দাবি জানান। তবে প্রত্যাশিত সাড়া না পেয়ে বিকেলে হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবন ৭, লোক কল্যাণ মার্গ-এর সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

এতে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

রাহুলের বার্তা: 'সরকার কোনো দায় নিতে চায় না'

অবস্থান কর্মসূচির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একাধিক পোস্ট করেন রাহুল গান্ধী।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের জবাব দিতে চায় না এবং সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও এড়িয়ে যাচ্ছে।

রাহুল বলেন, দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংসের দায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।

আরেকটি পোস্টে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে ভারতের প্রতিটি পরিবারের ওপর হামলা। তিনি দেশবাসীকে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের আহ্বানও জানান।

আহত শিক্ষার্থীদের দেখে আন্দোলনে যোগ

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে যাওয়ার আগে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে গিয়ে পুলিশের অভিযানে আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ নেন।

সেখান থেকে তাঁরা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে যান। পরে সেখানেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির সিদ্ধান্ত হয়।

বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান শুরু করেন।

বিরোধী নেতাদের সমাগম

অবস্থান কর্মসূচিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বিরোধী নেতা যোগ দেন।

কেরালা ও কর্ণাটকের কংগ্রেস নেতাদের পাশাপাশি এনসিপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হন।

কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা এ সময় সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা, পরে অচলাবস্থা

অবস্থানের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন আন্দোলনস্থলে গিয়ে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন।

পরে জিতেন্দ্র সিং সাংবাদিকদের জানান, রাহুল গান্ধী সংসদে শিক্ষার্থী ইস্যু নিয়ে আলোচনা চেয়েছিলেন এবং সরকার বুধবারই সে বিষয়ে আলোচনায় রাজি ছিল।

তবে তাঁর দাবি, পরে কংগ্রেস শুধু আলোচনায় রাজি না থেকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও দাবি করে।

সরকার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে অচলাবস্থা তৈরি হয়।

জোর করে সরিয়ে দেয় পুলিশ

সন্ধ্যার দিকে দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু করে।

রাহুল গান্ধীকে মাটিতে শুয়ে প্রতিরোধ করতে দেখা যায়। পরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে জোর করে তুলে বাসে ওঠান।

এ সময় ধস্তাধস্তির মধ্যে তাঁর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়।

পুলিশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের বাসে তুলে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়।

রাহুল গান্ধীকে দিল্লির ছত্রশাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে মন্দির মার্গ থানায় নেওয়া হয়। পরে রাত প্রায় ৯টার দিকে তাঁদেরও মুক্তি দেওয়া হয়।

ঘটনার খবর পেয়ে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী থানায় যান।

শিক্ষার্থী আন্দোলনের পটভূমি

ভারতে মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে গত দুই মাস ধরে দেশজুড়ে আন্দোলন চলছে।

আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

সোনম ওয়াংচুকের অনশন

আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক প্রায় এক মাস আগে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন।

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আগে দিল্লি পুলিশ তাঁকে যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে।

এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়।

মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্ট নির্দেশ দেন, সোনম ওয়াংচুক তাঁর পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার অধিকার রাখেন। পরে তাঁকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি জানিয়েছেন, হাসপাতাল পরিবর্তন হলেও সোনম ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করবেন না।

আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা

আন্দোলনকারীদের সংগঠন জানিয়েছে, আপাতত সংসদ ভবন অভিমুখে নতুন কোনো কর্মসূচি দেওয়া হবে না। তবে দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ—কোনো দাবিই সরকার গ্রহণ করেনি।

রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে

কয়েক দিন ধরেই ভারতের বিভিন্ন বিরোধী দল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। শুরুতে কংগ্রেস সরাসরি মাঠে না থাকলেও পরে আন্দোলনের সঙ্গে প্রকাশ্যে একাত্মতা ঘোষণা করে।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে কংগ্রেসের অবস্থান কর্মসূচিকে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত সুরক্ষিত এই এলাকায় এর আগে কোনো রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেনি।

শিক্ষার্থী আন্দোলন, বিরোধী দলের ধারাবাহিক চাপ এবং সংসদে এ ইস্যুতে সম্ভাব্য বিতর্ক—সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স