প্রস্তাবিত ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির বিরোধিতায় দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ‘কিষান মহাপঞ্চায়েতে’ যোগ দিতে পাঞ্জাবের শত শত কৃষক মঙ্গলবার রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হলেও হরিয়ানা সীমান্তে আবারও পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন। পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তের শম্ভু প্রবেশপথে ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের অগ্রযাত্রা আটকে দেয় হরিয়ানা পুলিশ। এতে দুই বছর আগের ‘দিল্লি চলো’ কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি আবারও ফিরে এসেছে।
কৃষকেরা অভিযোগ করেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে রাজধানীতে গিয়ে নিজেদের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সীমান্তে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে।
আবারও শম্ভু সীমান্তে অচলাবস্থা
পাঞ্জাব থেকে দিল্লিতে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট শম্ভু সীমান্তে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সীমান্তজুড়ে ব্যারিকেড বসিয়ে কৃষকদের গাড়িবহর থামিয়ে দেওয়া হয়।
এই দৃশ্য অনেকের কাছেই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয়েছে। সে সময়ও কৃষকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে কংক্রিটের ব্লক, লোহার পেরেক, কাঁটাতারের বেড়া এবং বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যারিকেড বসিয়েছিল প্রশাসন।
দিল্লির পথে যেতে না পেরে কৃষকেরা শম্ভু সীমান্তেই অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদের অধিকার বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তোলেন।
পাঞ্জাব সরকারের ভূমিকাতেও ক্ষোভ
ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের (বিকেইউ-শহীদ ভগত সিং) নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরেই ব্যারিকেড স্থাপন করেছে। অথচ পাঞ্জাব সরকার বিষয়টি প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তাঁর ভাষায়, রাজ্য সরকার কার্যত ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকা পালন করছে।
তবে পাঞ্জাবের কৃষকদের আটকে দেওয়া হলেও হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্রসহ বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে মহাপঞ্চায়েত
‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র উদ্যোগে আয়োজিত কিষান মহাপঞ্চায়েতে অংশ নিতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের বিভিন্ন কৃষক সংগঠন একজোট হয়েছে।
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাবিত ভারত–মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবি জানানো।
কিষান মজদুর সংগ্রাম কমিটির (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের জানান, কেএমএসসি, কিষান মজদুর মোর্চা (পাঞ্জাব), আজাদ কিষান মোর্চা এবং বিকেইউ একতা সংগ্রামের গাড়িবহর পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করলেও শম্ভু সীমান্তে এসে থেমে যেতে বাধ্য হয়।
কেন চুক্তির বিরোধিতা?
কৃষক নেতাদের দাবি, প্রস্তাবিত ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তি শুধু শুল্ক কমানো বা আমদানি-রপ্তানির বিষয় নয়; এটি দেশের কৃষি, দুগ্ধশিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়নীতি, মেধাস্বত্ব এবং সেবাখাতসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতকে প্রভাবিত করবে।
তাঁদের ভাষ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ভারত–মার্কিন যৌথ বিবৃতিতে ওই বছরের শরতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বর্তমান আলোচনা চলছে।
মার্কিন কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
কৃষক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের কৃষি ও দুগ্ধবাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার চাইছে।
তাঁদের দাবি, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিবেদনে নিয়মিতভাবে সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, পোলট্রি এবং মৎস্যপণ্যের ওপর ভারতের শুল্ক ও অন্যান্য বিধিনিষেধ কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কৃষক নেতাদের আশঙ্কা, এসব পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দিলে ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষিপণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ভারতের কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক টিকে থাকতে পারবেন না।
দুগ্ধ খাতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
সংগঠনগুলোর মতে, ভারতের দুগ্ধশিল্প প্রায় আট কোটি গ্রামীণ পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তাঁদের সতর্কবার্তা, এই খাতে সামান্য নেতিবাচক প্রভাবও শুধু দুগ্ধ উৎপাদক নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
কৃষক সংগঠনগুলোর আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, সম্ভাব্য চুক্তির খসড়া বা মূল বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
তাঁদের দাবি, কৃষক, শ্রমিক, দুগ্ধ উৎপাদক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করেই গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তির দিকে এগোনো হচ্ছে।
‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে—
প্রস্তাবিত ভারত–মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করতে হবে;
কৃষক, শ্রমিক, দুগ্ধ উৎপাদক ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করতে হবে;
জাতীয় স্বার্থ ও কৃষিখাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি করা যাবে না।
কৃষক নেতারা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবি বিবেচনায় না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তাঁরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।