মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ায় আর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা। বিরোধী দল যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্য নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিকভাবে আটকে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও সংকুচিত করার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গত রোববার ১৯৭৯ সালের সান্দিনিস্তা বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এ ঘোষণা দেন ৮০ বছর বয়সী ওর্তেগা। ওই বিপ্লবের মাধ্যমে নিকারাগুয়ার স্বৈরশাসক আনাস্তাসিও সোমোসাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। বিদ্রূপাত্মকভাবে, সেই বিপ্লবের অন্যতম নেতা ওর্তেগার বিরুদ্ধেই এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে ওর্তেগা বলেন, “এখানে আর কোনো নির্বাচন হবে না। তারা (বিরোধী দলগুলো) যাতে সরকার দখল করতে বা ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে না পারে, সে জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণাধীন জাতীয় পরিষদ (কংগ্রেস) ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে। তাঁর ভাষায়, এসব আইন এমন একটি “প্রাচীর” তৈরি করবে, যা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারী ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা ব্যক্তিদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করবে।
বিরোধীদের জন্য ‘প্রাচীর’ গড়ার ঘোষণা
ড্যানিয়েল ওর্তেগা বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রচেষ্টা ঠেকাতে সরকার আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করবে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবে তিনি স্পষ্ট করেননি, আগামী বছরের নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন পুরোপুরি বাতিল করা হবে, নাকি বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হবে।
গণতন্ত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা
নিকারাগুয়ায় ২০০৭ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন ড্যানিয়েল ওর্তেগা। গত কয়েক বছরে তাঁর সরকার বিরোধী দল, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করেছে বলে আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ।
২০২১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে বিরোধী শিবিরের প্রায় সব সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানো হয়। ফলে কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ওর্তেগা আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বশেষ ঘোষণাটি সেই ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়।
সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতা আরও সুসংহত
ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে গত বছর সংবিধানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীও অনুমোদন করান ওর্তেগা।
এসব পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে—
প্রেসিডেন্টের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা;
তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তাঁর স্ত্রী রোজারিও মুরিলোকে কো-প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করা;
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ আরও জোরদার করা।
সমালোচকদের অভিযোগ, এসব সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিকারাগুয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
সরকারি কর্মীদের বাধ্যতামূলক উপস্থিতির অভিযোগ
ওর্তেগার বক্তব্য যে অনুষ্ঠানে দেওয়া হয়, সেখানে কয়েক হাজার সরকারি কর্মী উপস্থিত ছিলেন। তবে স্থানীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল।
এদিকে দীর্ঘ ৬১ দিন জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকার পর এই অনুষ্ঠানেই প্রথমবার প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট ওর্তেগা।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়তে পারে
আগামী বছর নিকারাগুয়ার জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণার পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত করা কিংবা নির্বাচন স্থগিত করার যেকোনো উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার এবং বিরোধী রাজনীতিকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার কৌশলের অংশ হিসেবেই ওর্তেগার সর্বশেষ ঘোষণাকে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য বাস্তবায়িত হলে নিকারাগুয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ আরও গভীর সংকটের মুখে পড়তে পারে।