ঢাকা

ইস্ট ওয়েস্টের লেকচারে হোসেন জিল্লুর রহমান—‘পরিবর্তনের চাবিকাঠি নাগরিকদের হাতেই’

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক পাবলিক লেকচারে দেশের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে নাগরিকদের ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সস্তা শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে উদ্ভাবন, দক্ষতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্মত শিক্ষাভিত্তিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি-এর মঞ্জুর এলাহী অডিটোরিয়ামে ‘পরিবর্তনের চাবিকাঠি: আজকের জিজ্ঞাসা’ শীর্ষক পাবলিক লেকচারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।

পরিবর্তনের ছয় চালিকা শক্তির কথা তুলে ধরলেন হোসেন জিল্লুর

বক্তৃতায় হোসেন জিল্লুর রহমান সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তির কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হলো—বর্ণনা (ন্যারেটিভ), প্রতিষ্ঠান (ইনস্টিটিউশন), সামাজিক রীতিনীতি (নর্মস), উদ্যোগ (ইনিশিয়েটিভস), ক্ষমতা (পাওয়ার) এবং গোষ্ঠীতন্ত্র (ইন্টারেস্ট গ্রুপ)।

তিনি বলেন, এসব উপাদান সমাজ ও অর্থনীতিকে একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য এসব ক্ষেত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা ও সংস্কার করা প্রয়োজন।

সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হওয়ার আহ্বান

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসী আয়ের মতো সস্তা শ্রমনির্ভর অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। এই মডেল থেকে বের হয়ে জ্ঞান, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সঙ্গে দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের অর্থনীতি এক ধরনের স্থবিরতার মধ্যে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্র, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধে সংস্কারের তাগিদ

ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁর মতে, রাষ্ট্রকে জনগণের ওপর কর্তৃত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং মানুষের সেবক হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন পেশায় পেশাদারিত্বের ঘাটতি দূর করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সামাজিক আচরণ ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে সামাজিক রীতিনীতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

‘পরিবর্তনের শক্তি নাগরিকদের মধ্যেই রয়েছে’

বক্তৃতার শেষাংশে ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে নাগরিকদের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

তিনি বলেন, দেশের সংকটময় সময়ে সাধারণ মানুষের উদ্যোগ, উদ্ভাবনী শক্তি এবং সামাজিক অংশগ্রহণই বারবার সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাই ভবিষ্যতের পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠিও নাগরিকদের হাতেই রয়েছে।

উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, দেশের উন্নয়নের সুফল এখনো সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

তিনি বলেন, এসব মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও ন্যায্যতার ঘাটতি দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতি

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামস রহমান। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স