বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে দায়ী ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষা দুর্বল করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক প্রাথমিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় টিকার কার্যকারিতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, বর্তমান অনুসন্ধানের ফলাফল তা সমর্থন করে না। তবে নিয়মিত টিকা গ্রহণের বয়সের আগেই, বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন এবং ১৫ হাজারেরও বেশি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীও রয়েছেন।
হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ওপর গবেষণা
আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট যৌথভাবে ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত একটি হাসপাতালভিত্তিক অনুসন্ধান পরিচালনা করে। এতে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ৩২৪ জনের শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের মতে, জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়, অথচ নিয়মিত টিকাদানের প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সের আগে দেওয়া হয় না। ফলে এই বয়সী শিশুরা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে।
গবেষণায় শিশুদের চারটি দলে ভাগ করা হয়। এতে দেখা যায়, যেসব শিশু এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। আবার টিকার দুই ডোজ নেওয়া শিশুদের মধ্যেও কিছু ক্ষেত্রে হাম শনাক্ত হলেও সেই হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এই ফলাফল থেকে দেশের সব শিশুর ক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতার হার নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ গবেষণাটি শুধুমাত্র হাসপাতালে ভর্তি সন্দেহভাজন রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে; সুস্থ বা আক্রান্ত নয়—এমন শিশু এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাই জাতীয় পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা নির্ণয়ে আরও বৃহৎ জনগোষ্ঠীভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
ভাইরাসের ধরন ও জিনগত বিশ্লেষণ
গবেষণায় শনাক্ত হওয়া ভাইরাসটি বি৩ (B3) জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবেও পাওয়া গেছে।
আইসিডিডিআরবি ও আইইডিসিআর যৌথভাবে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করে। এতে ভাইরাসের এইচ-প্রোটিনে কয়েকটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হলেও, সেগুলো টিকার মাধ্যমে তৈরি হওয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের ভাইরাস এখনো একক সেরোটাইপ হিসেবে বিদ্যমান এবং প্রচলিত টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক অংশ শনাক্ত করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
আইসিডিডিআরবির ভাইরোলজি ল্যাবের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, গবেষণায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা থেকে বোঝা যায় ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, হাসপাতালে পরিচালিত এই গবেষণার ফলকে জাতীয় পর্যায়ের টিকার কার্যকারিতার চূড়ান্ত সূচক হিসেবে দেখা উচিত নয়।
গবেষকদের ধারণা, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশু আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—কিছু শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে যাওয়া কিংবা অপুষ্টিজনিত দুর্বলতা।
আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব ঘটল এবং কোথায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ জানান, টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হচ্ছে এবং শিশুদের শরীরে মাতৃসূত্রে পাওয়া রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কতদিন স্থায়ী থাকে—এসব বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা শুরু করা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের চারটি বিভাগীয় হাসপাতালে নতুন ক্লিনিক্যাল গবেষণাও চলছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে গবেষকেরা বলেছেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই হাম-রুবেলা টিকার সব ডোজ সম্পন্ন করা জরুরি।