এক দশকের পথচলার পর বন্ধ ‘দ্য প্রাইমারি স্কুল’; প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া ফলাফল, অর্থায়ন বন্ধ ও কৌশলগত পরিবর্তনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইস্ট পালো অল্টোতে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তাকে এক ছাতার নিচে এনে গড়ে তোলা হয়েছিল একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের স্ত্রী ও শিশুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রিসিলা চ্যানের সহপ্রতিষ্ঠিত ‘দ্য প্রাইমারি স্কুল’ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প শিক্ষামডেলের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
কিন্তু প্রতিষ্ঠার মাত্র এক দশক পরই বন্ধ হয়ে গেছে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ (সিজেডআই) থেকে ১২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থায়ন পেয়েও চলতি বছরের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বিদ্যালয়টি। এর আগে এপ্রিল মাসে পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতিক্রমে স্কুলটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একাডেমিক ফলাফলে প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, পরিচালনাগত নানা চ্যালেঞ্জ এবং প্রধান অর্থদাতা সিজেডআইয়ের অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত—এই তিনটি কারণই শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়।
ব্যতিক্রমী শিক্ষামডেল নিয়ে যাত্রা
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য প্রাইমারি স্কুলের লক্ষ্য ছিল শুধু পাঠদান নয়, বরং দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের শিশুদের সামগ্রিক বিকাশ নিশ্চিত করা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং পারিবারিক কল্যাণসেবা—সবকিছু একই কাঠামোর মধ্যে এনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে দাঁতের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শিশুদের বিকাশ মূল্যায়ন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিভাবকদের জন্য স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ পেতেন। নিয়মিত আয়োজন করা হতো শিশুর বিকাশ, অভিভাবকত্ব এবং পারিবারিক সহায়তা বিষয়ক কর্মশালাও।
প্রিসিলা চ্যান চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেছিলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মীরা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে শেখার সমস্যা, আচরণগত জটিলতা কিংবা বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করতেন। বিদ্যালয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারে ইংরেজির পরিবর্তে অন্য ভাষায় কথা বলা হতো, ফলে ভাষাগত বৈচিত্র্যও ছিল প্রতিষ্ঠানটির একটি বড় বাস্তবতা।
প্রতিষ্ঠার শুরুর বছরগুলোতে প্রিসিলা চ্যান নিজেও নিয়মিত স্কুলে যেতেন। তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে সময় কাটাতেন, বই পড়ে শোনাতেন এবং নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কার্যক্রমে অংশ নিতেন।
১২৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন, তবু বন্ধ
চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভের সবচেয়ে আলোচিত শিক্ষা প্রকল্পগুলোর একটি ছিল দ্য প্রাইমারি স্কুল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি ১২৫ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থায়ন করে।
তবে পরিচালনা পর্ষদ জানতে পারে, ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষ শেষে সিজেডআই আর এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে না। এরপরই বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জ্যাঁ-ক্লোদ ব্রিজার্ড বলেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সিজেডআইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। তবে প্রধান অর্থদাতার সমর্থন ছাড়া বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না।
অন্যদিকে সিজেডআইয়ের এক মুখপাত্র জানান, বিদ্যালয় বন্ধের সিদ্ধান্ত পরিচালনা পর্ষদের। তাঁদের দাবি, পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অগ্রগতিকে তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি শিক্ষার্থীদের ফলাফল
প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল একাডেমিক ফলাফল নিয়ে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের স্প্রিং সেশনে বিদ্যালয়ের তৃতীয় গ্রেড বা তার ঊর্ধ্বের মাত্র ২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ভাষাজ্ঞানসংক্রান্ত নির্ধারিত মান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গড় হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
যদিও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, শিক্ষাবর্ষ শেষে অষ্টম শ্রেণির ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী নির্ধারিত দক্ষতার মান অর্জন করেছিল।
প্রিসিলা চ্যানও গত বছর স্বীকার করেছিলেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অর্জন তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি।
পরিচালনায় ছিল নানা চ্যালেঞ্জ
বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা পরিচালনাগত বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন।
ঘন ঘন প্রধান শিক্ষক পরিবর্তন, একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক সহায়তার মতো বহুমাত্রিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন ধরনের শিক্ষামডেল বাস্তবায়ন—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
বিদ্যালয়ের সাবেক পরামর্শক ক্যাথরিন কার্টার বলেন, এ ধরনের সমন্বিত শিক্ষামডেল সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে যে পরিমাণ সময়, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন, সে বিষয়ে শুরুতে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি প্রচলিত সরকারি বিদ্যালয়গুলোর তুলনায় কিছু ভিন্নধর্মী নীতিও অনুসরণ করেছিল। শিক্ষকদের গোপনীয়তা চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে হতো। আবার ভাষা শেখার প্রাথমিক পর্যায়ে অভিভাবক ও সন্তানের কথোপকথন বিশ্লেষণের জন্য কিছু পরিবারকে রেকর্ডিং ডিভাইস ব্যবহারের পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতেও যুক্ত করা হয়েছিল, যা বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি করেছিল।
বদলে গেছে সিজেডআইয়ের অগ্রাধিকার
সিজেডআই জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে তাদের দাতব্য কার্যক্রমের কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হয়েছে। সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের পরিবর্তে এখন তারা বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বায়োমেডিক্যাল উদ্ভাবনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সংস্থাটির পরিকল্পনা ছিল, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যালয়টি সরকারি অর্থায়নের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে উঠবে। কিন্তু নতুন কোনো বড় অর্থায়নকারী বা দাতা সংস্থা পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে জ্যাঁ-ক্লোদ ব্রিজার্ড বলেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তির অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন দাতা খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। অনেকেই মনে করেন, এমন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের প্রয়োজন নেই।
শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা
বিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার সময় শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর স্থানান্তর প্রক্রিয়া সহজ করতে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে সিজেডআই।
এই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের ভবনের লিজ-সংক্রান্ত বকেয়া পরিশোধ, স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে সহায়তা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সঞ্চয় হিসাব চালু করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার ডলার, প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ২ হাজার ৫০০ ডলার এবং শৈশবকালীন শিক্ষাকেন্দ্রের প্রতিটি শিশুকে ১ হাজার ডলার করে দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে প্রায় ৫৪০ শিক্ষার্থীকে রেভেন্সউড সিটি এলিমেন্টারি স্কুল ডিস্ট্রিক্টে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো সংস্কার ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের নতুন স্কুল নির্বাচন, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং শিক্ষা সঞ্চয় হিসাব খুলতে অভিভাবকদের সহযোগিতা করছেন।
একটি বিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি কিছু
দ্য প্রাইমারি স্কুল অনেক পরিবারের কাছে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা এবং পারিবারিক পরামর্শের একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র।
প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর মা মেলে ফাকাপেলিয়া বলেন, তাঁদের পরিবারের জন্য বিদ্যালয়টি ছিল একটি নিরাপদ আশ্রয়। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু সন্তানদের শিক্ষাজীবনই নয়, পরিবারের জন্য গড়ে ওঠা সহায়তা ব্যবস্থাও হারিয়ে গেছে।
এক দশক আগে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত একটি নতুন মডেল হিসেবে যাত্রা শুরু করা দ্য প্রাইমারি স্কুলের সমাপ্তি দেখিয়ে দিল, বিপুল অর্থায়ন ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি শিক্ষা উদ্যোগ সফল করতে ধারাবাহিক ফলাফল, টেকসই অর্থায়ন এবং কার্যকর পরিচালন কাঠামো—সবকিছুর সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।