ঢাকা

পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা নেই, জানালেন ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাঁর পদত্যাগের গুঞ্জনকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা চুক্তিকে ঘিরে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি একাধিকবার পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট নিজেই এসব দাবিকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

একই সময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোও দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সমঝোতা কার্যকর করার জন্য ওমানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

সংবাদপত্রের খবরে শুরু হয় জল্পনা

পেজেশকিয়ানের পদত্যাগের গুঞ্জনের সূত্রপাত হয় ইরানের কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

প্রথম এ দাবি তোলেন দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির আত্মীয় এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাঘের খারাজি।

তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং সে কারণেই তিনি বারবার পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন।

খারাজির আরও দাবি, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সর্বোচ্চ নেতা তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন—আবার পদত্যাগের হুমকি দেওয়া হলে তা গ্রহণ করা হবে।

খামেনির কার্যালয়েরও অস্বীকৃতি

তবে এসব দাবির পরপরই সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়।

গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কার্যালয় থেকে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের পদত্যাগসংক্রান্ত প্রচারিত খবর ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’।

এ বক্তব্যের মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বও গুঞ্জনটি প্রত্যাখ্যান করে।

টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট অবস্থান

ক্ষমতায় দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন।

তিনি বলেন, মৌখিকভাবে কিংবা লিখিতভাবে তিনি কখনো পদত্যাগের প্রস্তাব দেননি।

পদত্যাগের গুঞ্জন সম্পর্কে তিনি বলেন,

“আমি যদি পদত্যাগ করতে চাই, তাহলে তা আনুষ্ঠানিকভাবেই ঘোষণা করব। আমি পদত্যাগ করব না, আমি দায়িত্বে থাকব।”

একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে দেশে বিভাজন সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।

‘মিথ্যাচার ছড়ানো হচ্ছে’

প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেহেদি তাবাতাবেইও এসব খবরকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি বলেন, পদত্যাগসংক্রান্ত প্রচারণা “সম্পূর্ণ বাজে কথা এবং মিথ্যাচার।”

তাঁর অভিযোগ, কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এসব গুজব ছড়াচ্ছে।

তাবাতাবেইর ভাষায়, “মিথ্যাবাদী, প্রতারক ও বেপরোয়া চরমপন্থীদের একটি অশুভ জোট” এ ধরনের তথ্য ছড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, এসব গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে পারছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধ

এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এনেছে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের অভ্যন্তরে বিদ্যমান মতপার্থক্য।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে।

পেজেশকিয়ান ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক ভবিষ্যতে ইরানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

এ অবস্থানকে দেশটির সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থী অংশ ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কট্টরপন্থী শিবিরের মধ্যে তা নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে।

কট্টরপন্থীদের কঠোর বিরোধিতা

ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস, যেখানে রক্ষণশীলদের প্রভাব বেশি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার ধারণার কড়া সমালোচনা করেছে।

প্রতিষ্ঠানটি এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী সমঝোতার প্রত্যাশাকে ‘বৃথা’ বলে উল্লেখ করেছে।

তাদের ভাষ্য, শান্তির নামে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, তাদের আচরণ ‘ক্ষমার অযোগ্য বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

হরমুজ চুক্তি ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ

এদিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো অন্তত একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যকর করতে ওমানকে উৎসাহিত করছে, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটেনি

পদত্যাগের গুঞ্জন নাকচ করলেও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সামনে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনো বহাল রয়েছে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার উদ্যোগ, অন্যদিকে দেশের কট্টরপন্থী শক্তির বিরোধিতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তাঁর সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সর্বশেষ বক্তব্যে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন না এবং সরকারের নীতি বাস্তবায়নে তাঁর অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স