ঢাকা

আল–সাইয়েদকে পরাজিত করতে রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা আইপ্যাকের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
আল–সাইয়েদকে ঠেকাতে এবার রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে কোটি কোটি ডলার খরচের প্রস্তুতিতে আইপ্যাক

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)–সমর্থিত প্রার্থী পরাজিত হওয়ার পর এবার সাধারণ নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে সংগঠনটি। লক্ষ্য একটাই—ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল আল–সাইয়েদকে সিনেটে যেতে না দেওয়া।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে আইপ্যাকের সুপার প্যাক ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট (ইউডিপি) কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সের পক্ষে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত আবদুল আল–সাইয়েদকে পরাজিত করা। তবে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। আল–সাইয়েদ ইতিহাস গড়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।

এখন নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইপ্যাকের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সংগঠনটির বড় দাতাদের একটি অংশ মনে করছেন, আল–সাইয়েদের বিরুদ্ধে আবারও কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

আইপ্যাকের মুখপাত্র ডেরিন সাউসা এক বিবৃতিতে বলেন, সংগঠনের সদস্যরা চান, নভেম্বরের নির্বাচনে ভোটাররা আবদুল আল–সাইয়েদ এবং তাঁর ভাষায় ‘চরমপন্থী ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান’ প্রত্যাখ্যান করুন। তবে ইউডিপির মুখপাত্র প্যাট্রিক ডর্টন জানিয়েছেন, সাধারণ নির্বাচনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনের শেষে ইউডিপির হাতে প্রায় ৮ কোটি মার্কিন ডলার ছিল। ফলে প্রয়োজন হলে বড় পরিসরে নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

আইপ্যাকের কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি আইপ্যাক সরাসরি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের পক্ষে প্রচারে নামে, তবে সেটি সংগঠনটির দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিচ্যুতি হবে।

আইপ্যাক বরাবরই দাবি করে এসেছে, তারা ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করে। ২০২২ সালের আগে ফেডারেল নির্বাচনে তারা সরাসরি অর্থ ব্যয়ও করত না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুপার প্যাকের মাধ্যমে বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কৌশল নিয়েছে সংগঠনটি।

আইপ্যাকের ঘনিষ্ঠদের মতে, আল–সাইয়েদকে তারা বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছে। কারণ, তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় স্পষ্টভাবে বলেছেন, নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেবেন।

রিপাবলিকান জুইশ কোয়ালিশনের রাজনৈতিক পরিচালক স্যাম মার্কস্টেইন বলেন, ‘চুপ করে থাকার সময় শেষ। আমরা ভয় পাব না। জিততে যা প্রয়োজন, আমরা সেটাই করব।’

আল–সাইয়েদের পাল্টা বার্তা

প্রাইমারিতে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর আবদুল আল–সাইয়েদ ইহুদি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তাঁর নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের মতোই দৃঢ়।

তবে একই সঙ্গে তিনি আইপ্যাকের নির্বাচনী অর্থ ব্যয়েরও কঠোর সমালোচনা করেন। প্রচারণার শেষ দিকে তিনি প্রকাশ্যেই আইপ্যাককে সাধারণ নির্বাচনেও তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ ব্যয়ের আহ্বান জানান।

আল–সাইয়েদ বলেন, ‘আইপ্যাক, যদি আমার কথা শুনে থাকো, তাহলে সাধারণ নির্বাচনেও এসো। যত খুশি অর্থ ব্যয় করো। আমি খুশি মনে সেই অর্থ নষ্ট করব। এরপর আমরা আসল কাজ শুরু করব—দেশ পরিচালনা এবং এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কি অন্য একটি দেশের স্বার্থে পরিচালিত হবে?’

অর্থ ব্যয় উল্টো ফল দিয়েছে?

নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে আইপ্যাকের বিপুল অর্থ ব্যয় শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে। কারণ, আল–সাইয়েদ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেন্সকে ‘বাইরের অর্থের প্রার্থী’ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন। আইপ্যাকের অর্থায়নের বিষয়টিকে তিনি নিজের প্রচারণার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

শেষ পর্যন্ত খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে জয় পেলেও ডেমোক্রেটিক প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন তিনি।

তবে আইপ্যাকের নেতৃত্ব এ ফলাফল নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অনুশোচনা দেখায়নি। সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, শুরু থেকেই তারা এই লড়াইকে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

বদলে যাচ্ছে মার্কিন রাজনীতির বাস্তবতা

দীর্ঘদিন ধরে আইপ্যাক দাবি করে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান দলেই ইসরায়েলপন্থী অবস্থান রাজনৈতিকভাবে লাভজনক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয় ও মিশিগানের মতো অঙ্গরাজ্যে ইসরায়েলের সমালোচক প্রার্থীরা ধারাবাহিকভাবে প্রাইমারিতে জয় পাচ্ছেন। ফলে আগামী কংগ্রেসে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মিশিগানের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্রেটিক ভোটারের আইপ্যাক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। বিপরীতে মাত্র ১২ শতাংশ ভোটার সংগঠনটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেন।

আগের অভিজ্ঞতাও সুখকর নয়

আইপ্যাকের সুপার প্যাক ইতিমধ্যে কয়েকটি নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল পায়নি। এর আগে পিটসবার্গের ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য সামার লি–এর বিরুদ্ধে প্রায় ১২ লাখ ডলার ব্যয় করেও তাঁকে হারাতে পারেনি।

চলতি বছর ইলিনয়ের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতেও আইপ্যাক–সমর্থিত রাজনৈতিক কমিটিগুলো লরা ফাইন–এর পক্ষে প্রায় ৪৪ লাখ ডলার ব্যয় করেছিল। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণাজুড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ড্যানিয়েল বিস আইপ্যাকের সমর্থনকে বড় ইস্যুতে পরিণত করেন এবং শেষ পর্যন্ত জয় পান।

অন্যদিকে আইপ্যাকের সমালোচক এবং তুলনামূলক উদারপন্থী ইসরায়েল–সমর্থক সংগঠন জে স্ট্রিট–এর সভাপতি জেরেমি বেন–আমি মনে করেন, রিপাবলিকান প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন করলে সেটি আইপ্যাকের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় ভুল হবে।

তাঁর ভাষায়, ‘বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতে না পারা এবং সময়ের পরিবর্তন উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়াই আইপ্যাকের সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

এদিকে মিশিগান রিপাবলিকান পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান রন ওয়াইজার মনে করেন, আইপ্যাকের উচিত মাইক রজার্সের পক্ষে অর্থ ব্যয় করা। তাঁর দাবি, তিনি এমন কোনো কণ্ঠস্বর আর দেখতে চান না, যারা ইসরায়েলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়।

সব মিলিয়ে, মিশিগানের এই নির্বাচন শুধু একটি সিনেট আসনের লড়াই নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতি, রাজনৈতিক অর্থায়নের প্রভাব এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে মধ্যপ্রাচ্য–বিষয়ক অবস্থানের পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স