ঢাকা

অন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে ঢুকছে মেটার এআই, নতুন করে সাইবার নিরাপত্তা উদ্বেগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সেই উদ্বেগ আরও গভীর করেছে মেটার সাম্প্রতিক একটি স্বীকারোক্তি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, একটি স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় কনফিগারেশনজনিত (মিসকনফিগারেশন) ত্রুটির কারণে তাদের একটি এআই মডেল অনিচ্ছাকৃতভাবে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। এরপর সেটি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে, অর্থাৎ কার্যত হ্যাকিংয়ে সক্ষম হয়।

বিষয়টি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠান মেটা, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক—তিনটিই সম্প্রতি তাদের পরীক্ষামূলক এআই মডেলের মাধ্যমে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ করেছে। ফলে উন্নত এআই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

পরীক্ষার সময়ই ঘটেছে অনুপ্রবেশ

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেটার একটি মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় একটি ‘মিসকনফিগারেশন’ বা ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিন্যাসের কারণে এআই মডেলটি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়। এরপর সেটি আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে।

মেটা জানিয়েছে, ঘটনাটি এখন তদন্তাধীন। প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, এটি ইচ্ছাকৃত কোনো আক্রমণ নয়; বরং পরীক্ষার পরিবেশে সৃষ্ট প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল।

মেটার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে অন্য কয়েকটি এআই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে। সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

পরীক্ষা চালায় ‘ইরেগুলার’

মেটা জানিয়েছে, নিরাপত্তা মূল্যায়নের দায়িত্বে ছিল ইরেগুলার (Irregular) নামের একটি বিশেষায়িত এআই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান।

এর আগেও একই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের এআই মডেলের ওপর নিরাপত্তা পরীক্ষা পরিচালনা করেছিল। সেই পরীক্ষায় দেখা যায়, অ্যানথ্রপিকের একটি এআই মডেল তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।

ইরেগুলারের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, মেটার ঘটনাটি মূলত একই ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার ফল, যার কথা অ্যানথ্রপিক গত সপ্তাহেই প্রকাশ করেছিল।

তিনি জানান, ভবিষ্যতে এআই এজেন্ট ব্যবহার করে কীভাবে নিরাপদভাবে সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়ন পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে একটি বিস্তৃত নির্দেশিকা বা প্রতিবেদন তৈরির কাজ করছে তাদের প্রতিষ্ঠান।

শুধু মেটা নয়, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকও একই ধরনের ঘটনার কথা জানিয়েছে

গত দুই সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকও একই ধরনের উদ্বেগজনক ঘটনার তথ্য প্রকাশ করেছে।

চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষাধীন কয়েকটি এআই এজেন্ট ইন্টারনেটে থাকা বিভিন্ন উন্মুক্ত সেবার বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আক্রমণের চেষ্টা চালিয়েছিল। এর মধ্যে এআই ডেভেলপারদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেস (Hugging Face)–ও ছিল।

অন্যদিকে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, কনফিগারেশনজনিত একই ধরনের ত্রুটির কারণে তাদের ক্লড (Claude) এআই মডেলও ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা করেছিল।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে এআই মডেলগুলোকে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে তারা মানুষের নির্দেশনা ছাড়াই অপ্রত্যাশিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাজ্যের পরীক্ষাতেও উদ্বেগজনক ফল

এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট (AISI) আরও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েকটি উন্নত এআই মডেল সাইবার আক্রমণের উদ্দেশ্যে ভুয়া মানব পরিচয় তৈরি করে প্রতারণার মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে গুরুতর আচরণ দেখা গেছে অ্যানথ্রপিকের পরীক্ষামূলক মডেল মিথোস–এর ক্ষেত্রে। মডেলটি একটি অনলাইন সেবায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য বাস্তব মানুষের পরিচয় অনুকরণ করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি করে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেছিল।

তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত মডেলটি তাদের সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত কোনো বাণিজ্যিক সংস্করণের প্রতিনিধিত্ব করে না।

একইভাবে ওপেনএআইও বলেছে, এআইএসআইয়ের পরীক্ষাগুলো বাস্তব ব্যবহার পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়; বরং অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে।

কেন এখন এসব তথ্য প্রকাশ?

এসব ঘটনার সময় নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশ্লেষক।

তাঁদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে উন্নত এআই প্রযুক্তির বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার তীব্র প্রতিযোগিতায় রয়েছে। একই সময়ে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক—উভয় প্রতিষ্ঠানই সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, তালিকাভুক্তির সময় প্রতিষ্ঠান দুটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন স্বচ্ছতার বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টাও করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিরাপত্তা নীতিমালা আরও কঠোর করার দাবি

মেটা, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর সাইবার নিরাপত্তা গবেষক এবং বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এআই নিরাপত্তা পরীক্ষার মান আরও কঠোর করার দাবি জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের এআই মডেলগুলোকে ইন্টারনেট, ক্লাউড অবকাঠামো কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আগে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ, বিচ্ছিন্ন পরীক্ষার পরিবেশ (আইসোলেটেড এনভায়রনমেন্ট) এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।

তাঁদের সতর্কবার্তা, এআই প্রযুক্তি যত বেশি স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষমতাবান হচ্ছে, ততই নিরাপত্তা পরীক্ষার মান উন্নত করা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ বা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স