ঢাকা

হাসিনার প্রত্যর্পণ ছাড়া ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের উদ্যোগ মানবে না এনসিপি: নাহিদ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

সোমবার দিবাগত রাত ১টা ৫ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাংলা ও ইংরেজিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ভারতের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ, সাম্প্রতিক একটি কথিত সংবাদ সম্মেলন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ—এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বন্ধ, শেখ হাসিনাসহ পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

‘হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সমাধান জরুরি’

নাহিদ ইসলাম তাঁর পোস্টে বলেন, গত দুই বছর ধরে ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়ে আসছে। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারব্যবস্থা ও জনগণের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে অবমাননা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের আপত্তি উপেক্ষা করে দিল্লিতে শেখ হাসিনার কথিত সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এনসিপির আহ্বায়কের মতে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি সমাধান না করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে তা বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।

ভারতের কাছ থেকে ‘কার্যকর জবাবদিহি’ দাবি

সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত কার্যকর জবাবদিহি আদায় করতে পারেনি বলেও অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দেওয়ার মধ্যেই দায়িত্ব শেষ করেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর আঘাতের অভিযোগ ওঠার পর ভারতের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট ও কার্যকর জবাবদিহি আদায় করা প্রয়োজন ছিল।

নাহিদ ইসলামের ভাষ্য, কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানো যথেষ্ট নয়; প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় দৃশ্যমান কূটনৈতিক পদক্ষেপও প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ নিয়েও প্রশ্ন

ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়টিও তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, ওই সাক্ষাতের সময় ৫ আগস্টের কথিত সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা, বক্তব্য বা দুঃখ প্রকাশের বিষয় সামনে আসেনি। বাংলাদেশের জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

নাহিদ ইসলামের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিরোধের বিষয়গুলোও সেখানে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের আগে দুই দেশের মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।

‘শেয়ার্ড ড্রিম’ মন্তব্য নিয়েও আপত্তি

ভারতীয় হাইকমিশনার দুই দেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে ‘শেয়ার্ড ড্রিম’ বা অভিন্ন স্বপ্নের কথা বলেছেন—এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কোনো কথিত সম্প্রসারণবাদী ‘শেয়ার্ড ড্রিম’-এর অংশীদার নয়। বাংলাদেশের জনগণ এমন কোনো সম্পর্কও মেনে নেবে না, যেখানে দিল্লি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ বা তাতে প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করে।

নাহিদ ইসলামের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব থাকা উচিত নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দক্ষিণ এশিয়া দেখতে চায়, যেখানে গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবাদকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার দাবি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে, সেটিকে এখন কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন নাহিদ ইসলাম।

তিনি কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সরকারের দৃঢ় ও দৃশ্যমান অবস্থান দাবি করেন।

এর মধ্যে রয়েছে ৫ আগস্টের কথিত ঘটনার বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশ, শেখ হাসিনা ও ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণ এবং ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বন্ধের নিশ্চয়তা।

নাহিদ ইসলামের মতে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

ভারতের ভূখণ্ড থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

এনসিপির আহ্বায়ক অভিযোগ করেন, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নেতারা বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন।

তিনি মনে করেন, একদিকে যদি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান ভারত সফর করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন, তাহলে সেই উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য প্রথমে এমন কর্মকাণ্ড বন্ধ করার নিশ্চয়তা প্রয়োজন, যেগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

‘বন্ধুত্বের অজুহাতে সার্বভৌমত্ব উপেক্ষা নয়’

নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বা উন্নত করা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী নয়। তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌম সমতা।

তিনি বলেন, বন্ধুত্বের অজুহাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করা যাবে না।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগে কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে, আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের আশ্রয় ও তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান আরও দৃঢ় ও শর্তনির্ভর হওয়ার দাবি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনোভাবেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া কিংবা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।

তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান না করে সম্পর্ককে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকবে না।

এনসিপির আহ্বায়কের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক স্বার্থ, সার্বভৌম সমতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর।

নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব প্রশ্নের সমাধান ছাড়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো উদ্যোগ বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স