আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, হত্যা ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুমের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁকে ‘বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন তিনি।
শনিবার বেলা ১১টায় ভোলার লালমোহন উপজেলা অডিটোরিয়ামে উপজেলা নাগরিক সমাজ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্পিকার। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
গুম-হত্যার ভয়াবহতার কথা তুলে ধরেন স্পিকার
গুম ও হত্যার বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বহু মানুষকে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীকে স্ত্রীর সামনে এবং সন্তানকে মায়ের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবার অনেককে হত্যার পর মরদেহ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো লোমহর্ষক ঘটনার কথাও এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে উঠে আসছে।
স্পিকার বলেন, এসব ঘটনার পরও অনেক মা-বাবা এখনো তাঁদের সন্তান ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। অথচ তাঁদের সন্তানদের হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ‘সেরা অভিনেত্রী’ বললেন স্পিকার
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ ও তাঁদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের বিষয়টিকে ‘অভিনয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে অভিনয়ের জন্য অনেক পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর মতে, বিশ্বের সেরা অভিনেত্রীর মতো অভিনয় করা একজনকে বাংলাদেশেই পাওয়া গিয়েছিল।
স্পিকার অভিযোগ করেন, কোনো ব্যক্তিকে গুম বা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা যখন গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতেন, তখন তিনি তাঁদের সান্ত্বনা দিতেন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন। অথচ তিনি নিজেই ওই ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে জানতেন—এমন অভিযোগ করেন স্পিকার।
হাফিজ উদ্দিন আহমদের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা গুম ও হত্যার সঙ্গে সরকারের সংশ্লিষ্টতার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
‘গুমের নির্দেশদাতা’ হওয়ার অভিযোগ
স্পিকার বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে দেওয়া সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণের কারণে বিষয়গুলো এখন জনগণের কাছে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তাঁর দাবি, এসব সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা গুমের নির্দেশদাতা ছিলেন—এমন অভিযোগের বিষয়টি জনগণের সামনে এসেছে।
তবে এসব বক্তব্য স্পিকারের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রতিবেদনে আলাদাভাবে বিবেচ্য।
দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে ‘বালিশ–কাণ্ড’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আবাসনসংক্রান্ত ব্যয়ের প্রসঙ্গও আনেন স্পিকার।
তিনি বলেন, প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য তৈরি করা আবাসিক ভবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছিল। উদাহরণ হিসেবে একটি বালিশের দাম ৬০ হাজার টাকা এবং একটি পর্দার দাম ৪২ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া তৎকালীন এক ভূমি প্রতিমন্ত্রীর লন্ডনে ৩৬০টি বাড়ি রয়েছে বলেও দাবি করেন স্পিকার। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, এসব প্রকল্পের কিছু ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজ না করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
গণ–অভ্যুত্থান ও দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গ
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে হাফিজ উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার বিষয়েও বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রীই নন, দেশের প্রধান বিচারপতি এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের ইমামও দেশ ছেড়ে গিয়েছেন।
বক্তব্যে তিনি বিগত সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে গুম, হত্যা, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
মতবিনিময় সভায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা
উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবালের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভা সঞ্চালনা করেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম।
এতে বিএনপি ও দলটির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সভায় দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিগত সরকারের কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।