ঢাকা

দিল্লিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ার আশঙ্কা অভিজিৎ দিপকের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা, নিরাপত্তা জোরদার করেছে দিল্লি পুলিশ; নিষেধাজ্ঞা না দিলেও সমাবেশের অনুমতি নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কনট প্লেসে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর কর্মসূচিকে ঘিরে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে। শুক্রবার বিকেলে কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচির আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নিজের এ শঙ্কার কথা জানান সিজেপির প্রতিষ্ঠাতাপ্রধান।

দিপকের অভিযোগ, দিল্লিতে তিনি যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানে সাদাপোশাকের পুলিশ সদস্যদের আনাগোনা বেড়েছে। নম্বরপ্লেটবিহীন গাড়ি বারবার যাতায়াত করছে এবং বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা কথা বলছেন। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন, তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন দিপকে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, শুক্রবার বিকেলের আগেই আমাকে গ্রেপ্তার করা হবে। দেশের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অপরাধে যদি কারাগারে যেতে হয়, তাহলে আমি প্রস্তুত।’

তাঁর অভিযোগ, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঠেকাতে সরকার ও পুলিশ ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে। এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে দিপকে প্রশ্ন তোলেন, ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে কর্মসূচি আয়োজন করতে চাইলে সরকার এত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে কেন।

কনট প্লেসে পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি

বৃহস্পতিবার দুপুরে দিল্লির প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিজিৎ দিপকে, বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ সমমনা বিভিন্ন সংগঠনের ব্যক্তিরা শুক্রবারের কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

ঘোষণা অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থল কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করার কথা। এ কর্মসূচিতে অংশ নিতে দলমত-নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানান দিপকে।

তিনি বলেন, যাঁরা দিল্লিতে এসে কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না, তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারেন। তাঁর দাবি, কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হবে এবং এটি নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার অংশ।

কর্মসূচির আয়োজকদের বক্তব্য, তাঁদের উদ্দেশ্য জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দাবির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তাঁরা ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

আদালত নিষেধাজ্ঞা দেননি, অনুমতি নেই বলছে পুলিশ

কনট প্লেসে কর্মসূচি আয়োজন নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের কর্মসূচি ঠেকাতে এলাকার ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করা হলেও আদালত কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রস্তাবিত সমাবেশ বা কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় অল্পসংখ্যক মানুষকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক শুক্রবার ও শনিবার পুরোপুরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া মধ্য দিল্লিতে ব্যাপকসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেছেন দিপকে। তাঁর দাবি, সেন্ট্রাল পার্কে ছয় হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং মধ্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় সব মিলিয়ে ৩২ হাজার পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকায় ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। এর ফলে চার বা তার বেশি মানুষের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

‘তেরঙ্গা ঝান্ডাকে সরকার এত ভয় পাচ্ছে কেন?’

বৃহস্পতিবার গভীর রাতের সংবাদ সম্মেলনে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যাপকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দিপকে। তাঁর অভিযোগ, এর আগেও ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঠেকাতে দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। সে সময় জম্মু-কাশ্মীর, ছত্তিশগড় ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের আনা হয় এবং ৪০ থেকে ৪৫ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

দিপকের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল। বাস, ট্রেন ও মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

এবার কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্ক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে দিপকে বলেন, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘিরে এত বড় নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রয়োজন কেন, তা সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সিজেপি যদি দেশের ১০০টি স্থানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে, তাহলে সরকার কি ১০০টি স্থানই অবরুদ্ধ করে দেবে? এমনকি প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিলে সেই সভাও কি বন্ধ করে দেওয়া হবে?

দিপকে বলেন, ‘তেলাপোকাদের’ এত ভয় কেন পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ও পুলিশ তাঁদের কর্মসূচি ঠেকাতেই অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে।

মোদি সরকারকে ‘দেশদ্রোহী’ বললেন দিপকে

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি আক্রমণ করে দিপকে বলেন, ভারতের অতীতের কোনো প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলনে কাউকে বাধা দেননি বলে তাঁর দাবি। অথচ বর্তমান সরকার এমন কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে আশুতোষ ও সৌরভ নামের ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে রাখার বিষয়টিও উল্লেখ করেন দিপকে। তাঁর অভিযোগ, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আটক করা হচ্ছে এবং অন্যদেরও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীকে ‘দেশদ্রোহী’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দিপকে আরও বলেন, ভারতের মাটিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে সরকারকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে।

তবে এসব বক্তব্য অভিজিৎ দিপকের রাজনৈতিক অভিযোগ ও মতামত। জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘিরে পুলিশি পদক্ষেপের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশনারকে সরানোর দাবিতে কর্মসূচি

সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির আইনি সেলের প্রধান রত্না সিংও দিপকের পাশে ছিলেন। দিপকে অভিযোগ করেন, রত্না সিংয়ের পেছনেও গোয়েন্দা সদস্যরা ঘুরছেন।

তিনি বলেন, তাঁদের মূল দাবি হলো মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া। এই দাবির পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দিপকে প্রশ্ন তোলেন, জ্ঞানেশ কুমার এমন কী সুবিধা দিচ্ছেন যে তাঁকে রক্ষা করতে সরকার এত তৎপর।

সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাঁদের কর্মসূচি ঠেকানো ছাড়া সরকার ও পুলিশের যেন আর কোনো কাজ নেই। এ পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

দিপকে নিজেকে মহাত্মা গান্ধী ও বাবাসাহেব আম্বেদকরের আদর্শের অনুসারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে গিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন। তাঁর মতে, এটি নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার।

মেট্রো স্টেশন বন্ধের পরিকল্পনা নেই: দিল্লি পুলিশ

এদিকে শুক্রবার সকালে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘিরে আয়োজকদের দাবি, পুলিশের অবস্থান এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। একদিকে আয়োজকেরা কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে তুলে ধরছেন, অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শুক্রবার বিকেলের কর্মসূচি ঘিরে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আয়োজকেরা সেখানে যেতে পারেন কি না এবং কোনো গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে কি না—তা নির্ভর করছে দিনের পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের ওপর।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স