ঢাকা

পর্নোগ্রাফি ও যৌন সহিংসতার যোগসূত্র, নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্য সরকারের উদ্যোগ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

শ্বাসরোধ, গলা চেপে ধরা ও অজাচারের দৃশ্যসংবলিত নির্দিষ্ট ধরনের পর্নোগ্রাফি প্রকাশ ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ হচ্ছে। আগামী ৬ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নতুন আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, অনলাইনে যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার প্রবণতা ঠেকানো এবং বিশেষ করে তরুণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

যৌন সহিংসতা মোকাবিলা এবং অনলাইনে সহিংস যৌন আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা ঠেকাতে পর্নোগ্রাফির ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য সরকার। নতুন বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ধরনের সহিংস ও ক্ষতিকর যৌন দৃশ্যসংবলিত পর্নোগ্রাফি প্রকাশ, প্রচার, ছড়িয়ে দেওয়া এবং নিজের কাছে সংরক্ষণ করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

আগামী ৬ নভেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই আইনের আওতায় শ্বাসরোধ বা গলা চেপে ধরার দৃশ্য, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যৌন সম্পর্কের দৃশ্য এবং প্রাপ্তবয়স্ক অভিনয়শিল্পীদের ১৬ বছরের কম বয়সী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—এমন নির্দিষ্ট ধরনের পর্নোগ্রাফি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

সরকারের প্রত্যাশা, নতুন আইন পর্নোগ্রাফি সরবরাহকারী ওয়েবসাইট ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর বার্তা দেবে। একই সঙ্গে অনলাইনে দেখা সহিংস যৌন আচরণ বাস্তব জীবনে অনুকরণের ঝুঁকি কমাতেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখবে।

সরকারি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সরকারি পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত ওই পর্যালোচনায় দেখা যায়, পর্নোগ্রাফির সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কিছু ওয়েবসাইটে শ্বাসরোধ ও গলা চেপে ধরার মতো সহিংস দৃশ্য ক্রমেই সাধারণ বিষয় হয়ে উঠছে।

পর্যালোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, এ ধরনের দৃশ্যের ব্যাপক প্রচার তরুণদের মধ্যে সহিংস যৌন আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। পর্নোগ্রাফিতে বারবার এমন দৃশ্য দেখার ফলে কেউ কেউ যৌন সম্পর্কের সময় সঙ্গীর প্রতি সহিংস আচরণকে গ্রহণযোগ্য বলে ভাবতে পারেন—যা বাস্তব জীবনে গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

পর্যালোচনার প্রধান ব্যারোনেস গ্যাবি বার্টিন বলেন, এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকর করার উপযুক্ত সময় এখনই। তাঁর মতে, নতুন আইনের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বৃহত্তর সমাজের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছাবে—বাস্তব জীবনে ক্ষতি করে, এমন চরম ও সহিংস দৃশ্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কিশোরের প্রশ্নে স্পষ্ট হয়েছিল ঝুঁকি

সরকারি পর্যালোচনায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরা হয়েছিল। ওই কিশোর তার এক শিক্ষকের কাছে জানতে চেয়েছিল, যৌন সম্পর্কের সময় কীভাবে মেয়েদের গলা চেপে ধরতে হয়।

ঘটনাটি পর্নোগ্রাফিতে প্রদর্শিত আচরণ কিশোরদের চিন্তাভাবনা ও যৌনতা সম্পর্কে ধারণাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, সে বিষয়ে উদ্বেগের একটি উদাহরণ হিসেবে পর্যালোচনায় উঠে আসে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, পর্নোগ্রাফিতে দেখা সহিংস আচরণ বাস্তব জীবনে অনুকরণ করার চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতি, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব যথাযথভাবে না বুঝলে এ ধরনের আচরণ শারীরিক ক্ষতি, মানসিক আঘাত কিংবা প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

তবে পর্নোগ্রাফি দেখার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সহিংস আচরণের সম্পর্ককে একক কারণ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, এ ধরনের কনটেন্টের সম্ভাব্য প্রভাব ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে পর্যালোচনাটি।

কোন কোন কনটেন্ট নিষিদ্ধ হচ্ছে

নতুন আইনে নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের পর্নোগ্রাফিকে অপরাধের আওতায় আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • যৌন পরিস্থিতিতে কাউকে শ্বাসরোধ করা বা গলা চেপে ধরার দৃশ্য।

  • পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যৌন সম্পর্কের দৃশ্য, যা অজাচার হিসেবে পরিচিত।

  • প্রাপ্তবয়স্ক অভিনয়শিল্পীদের ১৬ বছরের কম বয়সী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—এমন নির্দিষ্ট ধরনের পর্নোগ্রাফি।

এসব কনটেন্ট শুধু প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, নিজের কাছে সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও আইন প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি নিজের ফোন, কম্পিউটার বা ক্লাউড স্টোরেজে নিষিদ্ধ কনটেন্ট রাখলেও তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনলাইনে কনটেন্ট আপলোড করা, পোস্ট করা কিংবা অন্য কারও কাছে পাঠানোও অপরাধের আওতায় পড়বে। ফলে শুধু ওয়েবসাইট পরিচালনাকারী বা মূল প্রকাশক নন, নিষিদ্ধ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তিরাও আইনের মুখোমুখি হতে পারেন।

অপরাধভেদে কারাদণ্ডের বিধান

নতুন আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা আলাদা রাখা হয়েছে। নিষিদ্ধ পর্নোগ্রাফি প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্ক অভিনয়শিল্পীদের ১৬ বছরের কম বয়সী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়—এমন নির্দিষ্ট ধরনের পর্নোগ্রাফি নিজের কাছে সংরক্ষণ করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে, শ্বাসরোধ বা গলা চেপে ধরার দৃশ্য এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যৌন সম্পর্কের দৃশ্যসংবলিত নির্দিষ্ট ধরনের পর্নোগ্রাফি নিজের কাছে রাখলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

শাস্তির এই বিধানগুলো অনলাইনে নিষিদ্ধ কনটেন্ট তৈরি, প্রচার ও সংরক্ষণের বিভিন্ন ধরনকে আলাদাভাবে বিবেচনায় নেওয়ার অংশ। তবে কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে কী ধরনের অভিযোগ আনা হবে এবং কী শাস্তি প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান ও মামলার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

সম্মতি ছাড়া শ্বাসরোধ করা আগেই অপরাধ

যুক্তরাজ্যে কারও সম্মতি ছাড়া তাঁর শ্বাসরোধ করা বা গলা চেপে ধরা—এমনকি এতে মৃত্যু না হলেও—আগেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ইন্টারনেটে এ ধরনের আচরণ প্রদর্শনকারী পর্নোগ্রাফি প্রকাশ বা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আগে একই ধরনের নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

নতুন আইনের মাধ্যমে সেই আইনি ব্যবধান দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত এপ্রিলে পাস হওয়া অপরাধ ও পুলিশিং আইনের সংশোধনীতে নতুন বিধানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে নির্দিষ্ট ধরনের নিষিদ্ধ পর্নোগ্রাফি রাখা, প্রকাশ করা কিংবা ছড়িয়ে দেওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কেবল অনলাইনে কিছু কনটেন্টের প্রবেশাধিকার সীমিত করা নয়; বরং সহিংস যৌন আচরণকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন এবং তার সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব নিয়েও কঠোর অবস্থান নেওয়া।

আইন কার্যকর হওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞ

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ক্লেয়ার ম্যাকগ্লিন এর আগে সতর্ক করেছিলেন, সহজে পাওয়া যায় এমন কিছু পর্নোগ্রাফিক ভিডিও যৌন সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের কনটেন্টের বিস্তার এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

নতুন আইনের বিধান কার্যকর করার উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে—অনলাইনে প্রচারিত সহিংস যৌন দৃশ্যের প্রভাব, সম্মতি সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং বাস্তব জীবনে অনুকরণের সম্ভাব্য ঝুঁকি।

তবে নতুন আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যাবে, নিষিদ্ধ কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং ব্যক্তিগত ডিভাইস বা ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষিত কনটেন্টের ক্ষেত্রে আইন কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ অনলাইন পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন বিধিনিষেধের মাধ্যমে যৌন সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি কমবে এবং অনলাইনে ক্ষতিকর কনটেন্টের বিস্তার রোধে আইনগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স