ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা করছেন বহু মানুষ। সমালোচকদের অভিযোগ, এর প্রভাব বিশেষ করে মুসলিম, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গের সাহিদা ফকিরের ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে—ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি থাকার দাবি করা এই নারীকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকার ও বিজেপি বলছে, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং বাদ পড়া ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাহিদা ফকির এত দিন ভোট দেওয়ার অধিকারকে নিজের স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার হিসেবেই বিবেচনা করতেন। ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে তাঁর কাছে জন্মনিবন্ধন সনদ এবং ১৯৬২ সাল থেকে তাঁর পরিবারের গ্রামে জমিজমা থাকার নথি রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর মা-বাবার নামও কয়েক দশক ধরে ভোটার তালিকায় ছিল।
কিন্তু এসব নথি ও পারিবারিক ইতিহাস থাকার পরও গত এপ্রিলে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গের চূড়ান্ত সংশোধিত ভোটার তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পাননি ৩৮ বছর বয়সী সাহিদা। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর তাঁর জীবনে নেমে আসে আরও বড় বিপর্যয়। ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি থাকার দাবি করা সত্ত্বেও তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
সাহিদার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন—স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর—প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার পর নাগরিক অধিকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর থেকে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। তবে এই বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকেই জীবিত ও যোগ্য ভোটার ছিলেন; নির্বাচন কমিশনের যুক্তি অনুযায়ী, তালিকা সংশোধনের অংশ হিসেবে মৃত ব্যক্তি, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন এবং অন্যান্য অযোগ্য নামও বাদ দেওয়া হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো—এই প্রক্রিয়ায় কতসংখ্যক প্রকৃত ও যোগ্য ভোটারের নামও বাদ পড়েছে এবং তাঁদের পুনরায় তালিকাভুক্ত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
ভোটার তালিকা সংশোধন, নাকি ভোটাধিকার সংকুচিত করার প্রক্রিয়া?
ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্ভুল রাখার জন্য এসআইআর পরিচালনা করছে। কমিশনের যুক্তি, ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধন এবং অযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি দূর করা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জরুরি।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, বাস্তবে এই প্রক্রিয়ার প্রয়োগে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, যাচাই এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র, পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ বেশি বাধার মুখে পড়ছেন। ফলে যাঁদের ভোটার তালিকায় থাকার অধিকার রয়েছে, তাঁদেরও নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সমালোচকদের আরও অভিযোগ, অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করার যুক্তিতে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর অসম প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে মুসলিমদের একটি অংশকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সন্দেহ করার প্রবণতা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক নন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি, নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া আইনগতভাবে পৃথক বিষয়। এই পার্থক্য উপেক্ষা করা হলে ভোটার তালিকার প্রশাসনিক সংশোধন ব্যক্তির নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের স্বাধীনতার পর এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার নজির নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এসআইআর এখন শুধু নির্বাচনসংক্রান্ত প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সাহিদার ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল?
সাহিদার ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল চলমান থাকা অবস্থায় তাঁকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ ছিল, তিনি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী। পরে গত জুলাইয়ে তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
সাহিদার দাবি, তিনি কখনো বাংলাদেশে আসেননি এবং এ দেশের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর কাছে ভারতীয় নাগরিকত্বের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু সেই নথি দেখানোর পরও তাঁকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সীমান্তের একটি গ্রামে আশ্রয় নিয়ে থাকা সাহিদা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমি যে ভারতের নাগরিক, তা প্রমাণ করার মতো সব নথি আমার আছে। পুলিশকে বাংলাদেশে না পাঠানোর জন্য পায়ে পড়ে অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে সীমান্তের এপারে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়।”
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক কর্মকর্তার বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা সাহিদার নথি যাচাই করার কথা জানিয়ে বলেন, যাচাইয়ের পর তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন যে সাহিদা ভারতের নাগরিক।
তবে এই বক্তব্য ও সাহিদার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে কী আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানোর আগে কোন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত দিয়েছিল এবং তাঁর আপিলের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।
গত সেপ্টেম্বরে সাহিদার পরিবার তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। এ বিষয়ে জবাব দেওয়ার জন্য আদালত ভারত সরকারকে এক মাস সময় দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা রয়েছে। সাহিদার পরিবারের আবেদন নিষ্পত্তি হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সাহিদার আকুতি, তিনি পরিবারের কাছে এবং ভারতে নিজের বাড়িতে ফিরতে চান। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং পরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।
পশ্চিমবঙ্গে ‘বিদেশি’ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া বহু মানুষ নিজেদের দেশেই বিদেশি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ভোটাধিকার হারানোর পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ৮০ বছর বয়সী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ সিদ্দিকির অভিজ্ঞতা এই উদ্বেগের আরেকটি উদাহরণ। তাঁর দাবি, তাঁর দাদা ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং পরিবারের তিন প্রজন্মের নাম ভোটার তালিকায় ছিল। কিন্তু এসআইআরের পর তালিকায় নিজের নাম না দেখে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।
হেদায়েত উল্লাহ বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর থেকে তিনি সব সময় আতঙ্কে থাকেন। তাঁকে কোনো আটককেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তাঁর মধ্যে কাজ করছে। বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার চিন্তা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তাঁর বক্তব্য, তাঁর পূর্বপুরুষদের কবর ভারতে। দীর্ঘদিন ধরে এই দেশেই তাঁর পরিবারের বসবাস। তাই ভোটার তালিকায় নিজের নাম না থাকা তাঁর কাছে শুধু একটি প্রশাসনিক জটিলতা নয়; বরং নিজের পরিচয় ও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণ।
সাহিদা ও হেদায়েত উল্লাহর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, ভোটার তালিকার সংশোধন নিয়ে বিতর্কের প্রভাব কেবল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নাম বাদ পড়ার কারণে কেউ কেউ নিজেদের নাগরিক পরিচয়, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা এবং সম্ভাব্য আটক বা বহিষ্কারের ভয়েও ভুগছেন।
তবে এসব অভিজ্ঞতা থেকে পুরো প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া প্রত্যেক ভোটারের অবস্থা একই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নাম বাদ পড়ার কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথিপত্র এবং আপিলের ফলাফল পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দিল্লিতে বিক্ষোভ, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি
এসআইআর নিয়ে অসন্তোষ ক্রমেই রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লিতে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে ব্যারিকেড, সড়কে প্রতিবন্ধকতা এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ সময় বহু মানুষকে আটক করার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোও এসআইআরের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। গত সোমবার দিল্লিতে মিছিল করে তারা এই প্রক্রিয়াকে ভোটাধিকার সংকুচিত করার উদ্যোগ হিসেবে আখ্যা দেয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের বাদ দিয়ে নির্বাচনী মাঠে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জমা দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনরত ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এসআইআরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এক বিষয় নয়। এসআইআরের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে কতজন যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের কতজন আপিল করে নাম ফিরিয়ে পেয়েছেন এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব কেমন—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গ: নির্বাচনের আগে তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন
এসআইআর নিয়ে বিতর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক। বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের কিছু প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে এই প্রক্রিয়া বিজেপি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটকে নির্বাচনী সুবিধা এনে দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিহারে এসআইআর কার্যক্রমের সময় ৬০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ২০২টি আসনে জয় পায়।
তবে নির্বাচনে বড় জয় পাওয়াই ভোটার তালিকা সংশোধনের কারণে সুবিধা পাওয়ার প্রমাণ নয়। এসআইআর এবং নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাদ পড়া ভোটারদের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিন্যাস, তাঁদের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা এবং নির্বাচনের ফলাফলে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
বিজেপি এসআইআরের মাধ্যমে নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির বক্তব্য, ভোটার তালিকা নির্ভুল করার জন্যই এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। বিজেপির অভিযোগ, সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধীরা এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে।
দলটি আরও বলেছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করে পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারবেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, নাম বাদ পড়ার পর পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকলেও যাঁদের নথি সংগ্রহ করা কঠিন, যাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক কিংবা যাঁরা আইনি সহায়তা পাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না, তাঁদের জন্য এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক
এসআইআর নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা। সমালোচকদের মতে, ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের ফলে কমিশনের ওপর সরকারের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ওই পরিবর্তনের পর বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন নিয়োগ কমিটি জ্ঞানেশ কুমারকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ ফেলো রণজয় সেন মনে করেন, ভারতের নির্বাচন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রণজয় সেনের বক্তব্য, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবু নাগরিকদের মধ্যে এই বিশ্বাস ছিল যে তাঁরা ভোট দেওয়ার অধিকার ভোগ করেন এবং নির্বাচন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর মতে, এসআইআর যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা সেই বিশ্বাসকে দুর্বল করেছে।
গত মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য ১৪টি আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার তাঁদের আপত্তি খারিজ করে দেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো বড় একটি প্রশাসনিক উদ্যোগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন।
সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সমালোচনা
এসআইআরের সমালোচনা করেছেন ভারতের কয়েকজন সাবেক নির্বাচন কমিশনারও। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে—ভোটার তালিকায় যোগ্য নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার বদলে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না।
প্রতিবেদনে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও পি রাওয়াত ভোটার নিবন্ধন ফর্মে আনা কিছু পরিবর্তনকে ভুল ও অবৈধ বলে বর্ণনা করেছেন। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা অশোক লাভাসাও এসআইআর বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
অশোক লাভাসার বক্তব্য অনুযায়ী, কোটি কোটি মানুষের ওপর এমন একটি প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি জানতে চেয়েছেন, ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যা কী।
২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা এস ওয়াই কুরেশি আরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর মুসলিমদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি পরিকল্পিত হয়রানিমূলক প্রক্রিয়া।
কুরেশির মতে, ভারতের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের আবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের এসব বক্তব্য তাঁদের মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসআইআরের উদ্দেশ্য, বাস্তব প্রয়োগ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে স্বাধীন তথ্য-উপাত্ত, প্রশাসনিক নথি ও বিচারিক পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
সমালোচকদের একটি বড় উদ্বেগ হলো, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া কার্যত নাগরিকত্ব নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে কি না। তাঁদের মতে, ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার পর কাউকে বিদেশি হিসেবে সন্দেহ করা হলে তাঁর ওপর শুধু ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিই আসে না; আটক বা দেশ থেকে বহিষ্কারের আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
এই জায়গাতেই সাহিদার ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর তাঁকে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী সন্দেহে আটক ও বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ তাঁর দাবি, তিনি ভারতেই জন্মেছেন এবং তাঁর কাছে নাগরিকত্বের পক্ষে নথি রয়েছে।
এ ধরনের ঘটনায় কয়েকটি পৃথক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কী প্রমাণ বিবেচনা করা হয়েছে, বহিষ্কারের আগে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং আপিল নিষ্পত্তির আগেই তাঁকে অন্য দেশে পাঠানো আইনসম্মত ছিল কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সাহিদার মামলার আইনি বৈধতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ঘটনাটি ভোটার তালিকা সংশোধন, নাগরিকত্ব যাচাই এবং বহিষ্কারের প্রক্রিয়াকে স্পষ্টভাবে পৃথক রাখার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
সামনে কী?
এসআইআর ঘিরে বিতর্কের সমাধান নির্ভর করবে প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা, বাদ পড়া ভোটারদের জন্য কার্যকর প্রতিকার এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির ওপর। প্রথমত, কতজন মৃত বা অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং কতজন যোগ্য ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ গেছে—এ বিষয়ে স্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপিল নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ও বিচারিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন। তৃতীয়ত, নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের অভিযোগ উঠলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভারতের সরকার ও বিজেপি বলছে, এসআইআর ভোটার তালিকা নির্ভুল করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধী দল, মানবাধিকারকর্মী ও কয়েকজন সাবেক নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ, প্রক্রিয়াটি বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলেছে এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর আপিলব্যবস্থা এবং আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি।
সাহিদা ফকিরের কাছে বিষয়টি অবশ্য পরিসংখ্যান বা রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর কাছে এর অর্থ নিজের পরিবার, বাড়ি এবং পরিচিত জীবনে ফিরে যাওয়ার অধিকার। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, তিনি শুধু নিজের পরিবার ও ভারতে নিজের বাড়িতে ফিরতে চান।
সাহিদার সেই আকুতি ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে চলমান বিতর্কের মানবিক দিকটি সামনে আনে। একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সংগত, তা শুধু কতগুলো নাম বাদ পড়েছে দিয়ে নয়; বরং যোগ্য নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, ভুল সংশোধনের সুযোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা গেছে কি না—তা দিয়েও বিচার করা প্রয়োজন।