ঢাকা

‘সহিংসতার মাধ্যমে সরকার বদলাতে চায় আন্দোলনকারীরা’, বাংলাদেশ প্রসঙ্গ টানলেন রাজনাথ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

ভারতের জেন-জি আন্দোলনকে বাংলাদেশি আন্দোলনের প্রভাবে পরিচালিত বলে দাবি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর; রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের সমালোচনা, ভাইরাল ভিডিওর সত্যতা ও প্রকাশকাল নিয়ে রয়ে গেছে প্রশ্ন

ভারতের চলমান রাজনৈতিক আন্দোলনকে বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তাঁর দাবি, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং বিরোধীদের আন্দোলন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কিংবা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে সহিংসতার পথে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।

শুক্রবার লক্ষ্ণৌয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও বিরোধী দলগুলোর কঠোর সমালোচনা করেন রাজনাথ। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের তরুণদের অরাজক রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশে সংঘটিত আন্দোলনের আদলে ভারতে ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা চলছে।

রাজনাথের ভাষ্য, ‘দেশের যুবসমাজকে অরাজক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি বানানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো করে এখানেও ক্ষমতার পালাবদলের চেষ্টা চলছে।’

তবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বক্তব্যগুলোকে রাজনাথের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

‘আন্দোলন নির্বাচনী সংস্কারের জন্য নয়’

রাজনাথ সিংয়ের অভিযোগ, বিরোধীদের বর্তমান আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্বাচনী সংস্কার নয়; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করা এবং দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। আন্দোলনকারীদের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি দাবি করেন, তাঁদের কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলেছেন, সরকার পরিবর্তনের জন্য তাঁরা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রেরণা বা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আবার কেউ রাজপথের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানোর কথা বলেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এসব বক্তব্যের ভিত্তিতে রাজনাথ বলেন, আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই বিরোধীদের উদ্দেশ্য।

শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনেও কংগ্রেস ও তাদের মিত্রদের সমালোচনা করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, বিরোধীদের বক্তব্যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের মতো শব্দের ব্যবহার থেকেই বোঝা যায়, তাঁদের লড়াই নির্বাচনী সংস্কারের জন্য নয়।

রাজনাথের বক্তব্যে মূলত বিরোধীদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের বিস্তারিত জবাব তাঁর বক্তব্যে কীভাবে এসেছে, তা স্পষ্ট নয়।

রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসকে আক্রমণ

বিরোধীদের সমালোচনা করতে গিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন রাজনাথ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কংগ্রেসের নেতারা ‘গান্ধী’ নাম ব্যবহার করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।

রাজনাথের অভিযোগ, কংগ্রেস ও তাদের মিত্রদের মূল উদ্দেশ্য সংবিধানের মৌলিক কাঠামো দুর্বল করা এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। বিরোধীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে দলটির বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। বিরোধীদের আন্দোলনকে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করলেও রাজনাথ তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ তুলে ধরেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

নেহা বোরার ভিডিও ঘিরে বিতর্ক

রাজনাথের অভিযোগের আগে ভারতের জেন-জি তরুণদের আন্দোলনকে বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। বৃহস্পতিবার ভারতের বিজেপিপন্থী কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে নেহা বোরার একটি তারিখবিহীন ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

এক বিজেপি নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ৩৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে নেহা বোরাকে বলতে শোনা যায়, ভারতে বিভিন্ন এলাকায় জেন-জি তরুণদের যে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তার সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশে।

ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘এই দেশের আনাচকানাচে জেন-জিদের যে আন্দোলন আমরা দেখছি, তা প্রথমে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল। আমাদের পথ দেখানোর জন্য এবং এই দেশের তরুণদের প্রতি সংহতি জানানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন।’

ভিডিওটির বক্তব্যে বাংলাদেশে শুরু হওয়া আন্দোলনকে ভারতের তরুণদের আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের আন্দোলন ছিল গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবিতে। ভারতের তরুণেরা যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, সেটিও গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই বলে মন্তব্য করেন নেহা বোরা।

তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ছিল গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের জন্য। আজ আমাদের দেশের তরুণেরা যে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটাও গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকারের আন্দোলন।’

ভিডিওতে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে প্রতিবাদ এবং নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের প্রসঙ্গও এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওটির সত্যতা ও সময় নিয়ে প্রশ্ন

নেহা বোরার ভিডিওটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও ভারতের বিজেপিপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো ভিডিওটির ধারণকাল বা প্রামাণিকতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। ভিডিওটি কবে, কোথায় এবং কোন প্রেক্ষাপটে ধারণ করা হয়েছিল, তা-ও স্পষ্ট করা হয়নি।

ফলে ভিডিওটির বক্তব্যকে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার আগে এর উৎস, পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু সংক্ষিপ্ত ও তারিখবিহীন ভিডিওর ভিত্তিতে কোনো আন্দোলনের উৎপত্তি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এ ছাড়া নেহা বোরার বক্তব্য এবং রাজনাথ সিংয়ের অভিযোগের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে একটি যোগসূত্র তৈরি করা হলেও, ভিডিওটি থেকেই আন্দোলনকারীরা সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করছেন—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণিত হয় না।

বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রসঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের আন্দোলনকে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি রাজনাথের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশের মতো আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ভিডিওতে নেহা বোরা বাংলাদেশের আন্দোলনকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবিতে তরুণদের প্রতিবাদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

একই ঘটনাকে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপনের এই প্রবণতা ভারতের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজনাথ যেখানে বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনাকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা ও সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, সেখানে ভিডিওতে নেহা বোরা সেটিকে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে ভারতের আন্দোলনকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের সাংগঠনিক বা কৌশলগত সম্পর্ক এবং সহিংসতার অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সংক্ষিপ্ত ভিডিও একা এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না।

রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্যে বিরোধীদের আন্দোলনকে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে নেহা বোরার ভিডিওতে একই ধরনের আন্দোলনকে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের দাবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ভিডিওটির উৎস ও সময় সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত এই বিতর্কের বিভিন্ন দাবি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স