ঢাকা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করল চুয়েট দল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউটের (এসিআই) শরৎকালীন মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি প্রতিযোগিতায় সামগ্রিকভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একটি দল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) দল সামগ্রিকভাবে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে।

গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে চুয়েট ও আইইউটির দলগুলো সম্মিলিতভাবে চারটি পুরস্কার অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্য প্রকৌশলশিক্ষা ও নির্মাণপ্রযুক্তিতে তাঁদের দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরেছে।

মর্টার তৈরির দক্ষতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতা

মর্টার হলো বালু, সিমেন্ট, পানি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি একটি নির্মাণসামগ্রী। ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজে ইট বা অন্যান্য নির্মাণ উপাদান জোড়া লাগানো এবং নির্দিষ্ট নির্মাণকাজে এটি ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের মিশ্রণের কার্যকারিতা নির্ভর করে এর প্রবাহক্ষমতা, স্থিতিশীলতা, উপাদানের সঠিক অনুপাত এবং নির্মাণকাজে ব্যবহারের উপযোগিতার ওপর।

এসিআইয়ের মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের এমন একটি বালু-সিমেন্ট মিশ্রণের নকশা তৈরি করতে হয়, যা সহজে প্রবাহিত হতে পারে, একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং উৎপাদন ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্ষম হয়।

অর্থাৎ, শুধু ভালো মানের মর্টার তৈরি করাই এ প্রতিযোগিতার লক্ষ্য নয়; বরং কম খরচে এবং পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে কার্যকর নির্মাণসামগ্রী তৈরির সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

মূল্যায়নে যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দলকে কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে মর্টারের প্রবাহক্ষমতা, মিশ্রণের স্থিতিশীলতা, কারিগরি প্রতিবেদন, উৎপাদন ব্যয় এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সম্ভাব্য অবদানের পরিমাণ।

মর্টারের প্রবাহক্ষমতা নির্ধারণ করে মিশ্রণটি কতটা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জরুরি, যাতে মিশ্রণের উপাদানগুলো আলাদা হয়ে না যায় এবং এর কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন থাকে।

পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে নির্মাণসামগ্রীকে আরও সাশ্রয়ী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় থাকায় প্রতিযোগিতাটি পরিবেশবান্ধব নির্মাণপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করারও সুযোগ তৈরি করে।

চুয়েটের দুটি অর্জন

প্রতিযোগিতায় সামগ্রিকভাবে প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি ব্যয়সাশ্রয়ী নকশা বিভাগে দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে চুয়েটের দল। অর্থাৎ, সামগ্রিক পারফরম্যান্সে শীর্ষস্থান অর্জনের পাশাপাশি কম ব্যয়ে কার্যকর মর্টার তৈরির ক্ষেত্রেও দলটি নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে।

চুয়েট দলের ফ্যাকাল্টি উপদেষ্টা ছিলেন এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের পরিচালক জি এম সাদিকুল ইসলাম। তাঁর তত্ত্বাবধানে দলটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

দলটির সদস্যরা হলেন ফাহাদ আলম, সানি উল হক, রূপম পোদ্দার, তানজিম মুসাররাত তুষিন, মো. সাইজুদ্দিন ফরহাদ, সরূপ চন্দ্র মোদক, সুমাইয়া বিনতে মান্নান এবং সৈয়দ মো. আমির হামজা মাহাদী।

আইইউটির দুটি পুরস্কার

চুয়েটের পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) দল। বিশ্বের ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সামগ্রিকভাবে চতুর্থ স্থান অর্জনের পাশাপাশি দলটি আরও দুটি পুরস্কার পেয়েছে।

আইইউটি দল পরিবেশবান্ধব নকশা বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। এ ছাড়া কংক্রিটের নান্দনিকতা প্রতিযোগিতায় বিচারকদের পছন্দে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে দলটি।

পরিবেশবান্ধব নকশা বিভাগে এ অর্জন কম কার্বন নিঃসরণকারী নির্মাণসামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে দলটির কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, নান্দনিকতা বিভাগে পুরস্কার পাওয়া নির্মাণসামগ্রীর উপস্থাপন ও দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতার পরিচয় দেয়।

আইইউটি দলের উপদেষ্টা ছিলেন এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি মো. তারেক উদ্দিন।

দলটির সদস্যরা হলেন আরিনা তাহরিন আমিন, রাজিত মুহাম্মদ চৌধুরী, জাসিয়া জুবায়ের, লামিয়া তাবাসসুম, এস এম রাগিব শাহরিয়ার, মো. হুমায়েদ তাহসিন হক, মো. মাহাদী হাসান নিলয় এবং মো. জুহায়ের আনজুম।

বাংলাদেশি প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক অর্জন

প্রতিযোগিতায় চুয়েট ও আইইউটির সাফল্য বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও ব্যবহারিক দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরেছে। বিশেষ করে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান উন্নয়ন, ব্যয় কমানো এবং পরিবেশগত প্রভাব হ্রাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

এ ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধান, দলগত কাজ, পরীক্ষামূলক নকশা তৈরি এবং কারিগরি প্রতিবেদন প্রস্তুতের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এবারের প্রতিযোগিতায় চুয়েটের সামগ্রিক চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং আইইউটির চতুর্থ স্থান অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে ব্যয়সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

প্রতিযোগিতায় দলগুলোর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের পরিচালক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সাইফুল আমিন। তাঁর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি দলগুলোর সঙ্গে দেশের প্রকৌশলশিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তুলে ধরে।

সব মিলিয়ে, এসিআইয়ের শরৎকালীন মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি প্রতিযোগিতায় চুয়েট ও আইইউটির চারটি পুরস্কার অর্জন বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এ অর্জন ভবিষ্যতে নির্মাণপ্রযুক্তি, উপকরণ প্রকৌশল এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের আরও গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজে উৎসাহিত করতে পারে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স