দেশে চাঁদাবাজির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, এখন গরু-মহিষকে ঘাস খাওয়াতেও চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা না দিলে খামারের মাছের খাবারে বিষ মেশানোর মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। নিজের নির্বাচনী এলাকায় চাঁদাবাজি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন এই সংসদ সদস্য।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার প্রত্যন্ত পাকশিমুল ইউনিয়নের জয়দরকান্দি গ্রামের ১ ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় রুমিন ফারহানা চাঁদাবাজি, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা এবং নিজের নেতা-কর্মীদের আচরণ নিয়ে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজনকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের বিরুদ্ধেও অবস্থান জানান তিনি।
‘চাঁদাবাজি হলে রাস্তায় দাঁড়াব’
মতবিনিময় সভায় দেশের চাঁদাবাজির পরিস্থিতি তুলে ধরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বাংলাদেশের এখন এই অবস্থা হইছে যে গরু-মহিষরে ঘাস খাওয়াইতে হইলেও চান্দা দিয়া খাওয়াইতে হয়। চান্দা না দিলে খামারের মাছের খাবারে বিষ মেশানো হয়।’
নিজের নির্বাচনী এলাকায় কেউ চাঁদাবাজি করলে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমার এলাকায় চান্দাবাজি হইলে আমি কাউকে চিনি না। আমি তাঁর বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়াব।’
রাজনীতিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের প্রশ্রয় দিতে চান না বলেও জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ডান পাশে বালুচোর আর বাম পাশে মামলাবাজ নিয়ে আমি রাজনীতি করতে চাই না।’
তাঁর বক্তব্যে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রত্যয় উঠে আসে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতার কারণে কাউকে ছাড় দেওয়ার পক্ষপাতী নন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
আত্মীয়স্বজনকে সরকারি সুবিধা দেওয়ার বিরোধিতা
রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে থাকার কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর কোনো আত্মীয়ের সুপারিশ করার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, ‘আমার কোনো আত্মীয় নাই, যাকে সারের ডিলারশিপ দিতে হবে। আমার কোনো আত্মীয় নাই, যাকে রাস্তার কাজের ঠিকাদারি দিতে হবে। আমার কোনো আত্মীয় নাই, যাকে চান্দা দিয়া আপনাদের ব্যবসা করতে হবে।’
সারের ডিলারশিপ ও সড়ক নির্মাণের ঠিকাদারি পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের বিরোধিতা করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার জন্য কাউকে চাঁদা দিতে হবে—এমন পরিস্থিতি কাম্য নয় বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
স্থানীয় রাজনীতিতে স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে। এমন প্রেক্ষাপটে রুমিন ফারহানার বক্তব্যে সরকারি সুবিধা বণ্টন, ঠিকাদারি এবং ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে আহ্বান
নিজের অনুসারীদের আচরণ নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন রুমিন ফারহানা। তাঁর কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রেখে লিখিতভাবে তা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার কোনো কর্মীর বিষয়ে যেকোনো অভিযোগ থাকলে নাম–পরিচয় গোপন রেখে লিখিতভাবে আমাকে জানাবেন। আপনাদের পরিচয় আমি প্রকাশ করব না। কিন্তু সেই কর্মীর ব্যাপারে যে ব্যবস্থার নেওয়ার, আমি সে ব্যবস্থা নেব।’
নিজের কোনো কর্মী ভোটারের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘আমার কোনো কর্মী যদি আমার কোনো ভোটারের সঙ্গে একটুও বেয়াদবি করে, আমার ওই কর্মীর নাম আমার কাছে জমা দেবেন, বাকি ব্যবস্থাটা আমি করব।’
তাঁর এ বক্তব্যে নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের আচরণ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ শোনার পাশাপাশি অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
১৭ বছরের আন্দোলনের পরও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
মতবিনিময় সভায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর তাঁরা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করেছিলেন, যে সরকার মানুষের মৌলিক সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তাঁর প্রত্যাশার মধ্যে ছিল বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যার সমাধান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘১৭ বছর আমরা আন্দোলন–সংগ্রাম করেছি। আমরা আশা করেছিলাম, আমরা জনগণের একটা সরকার পাব, যারা বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে, গ্যাসের সমস্যা সমাধান করবে, আইনশৃঙ্খার পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাবে, জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে রাখবে।’
তবে তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী এসব সমস্যার সমাধান হয়নি। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সবজি ও ডিমের দাম নিয়ে উদ্বেগ
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রুমিন ফারহানা সবজি ও ডিমের দামের উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন দুর্ভাগ্য, ৮০–৯০ টাকা কেজির নিচে সবজি নাই। ঢাকা শহরে একটা ডিমের দাম ১৫ টাকা। গরিব খাবে কী?’
তাঁর বক্তব্যে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সবজি ও ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
রুমিন ফারহানার বক্তব্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি বাজারদর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা হিসেবে উঠে এসেছে।
স্থানীয় রাজনীতি ও জনস্বার্থের প্রশ্ন
জয়দরকান্দি গ্রামের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় রুমিন ফারহানার বক্তব্যে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান, রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি পরিহার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রত্যাশা।
নিজের নির্বাচনী এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর দলের বা অনুসারীদের কেউ অনিয়ম কিংবা ভোটারের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সব মিলিয়ে, স্থানীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে রুমিন ফারহানা চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি জনদুর্ভোগ কমানোর দাবি জানিয়েছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত চাঁদাবাজি, মাছের খাবারে বিষ মেশানো এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে সেগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।