সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু থাকা ‘মিড-ডে মিল’ বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাবার বিতরণের অভিযোগের পর তদারকি জোরদারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষার্থীদের খাদ্যনিরাপত্তা ও খাবারের মান নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়ভিত্তিক মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে Ministry of Primary and Mass Education।
সোমবার রাজধানীর মিরপুরে Directorate of Primary Education-এ আয়োজিত এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন।
অনিয়মের অভিযোগের পর কঠোর অবস্থান
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে পচা বা কাঁচা কলা, নিম্নমানের বানরুটি এবং নষ্ট সেদ্ধ ডিম বিতরণের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়।
মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ কর্মসূচিতে কোনো ধরনের গাফিলতি, অনিয়ম বা মানহীনতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
পাঁচ সদস্যের গার্ডিয়ান কমিটি
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি বিদ্যালয়ে পাঁচ সদস্যের একটি গার্ডিয়ান কমিটি গঠন করা হবে। এতে থাকবেন—
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির একজন সদস্য
তিনজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক (মা)
এই কমিটি শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের গুণগত মান, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশন এবং সামগ্রিক সেবার মান নিয়মিত তদারকি করবে।
বর্তমানে যেভাবে চলছে মিড-ডে মিল
শিশুদের পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধা প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক হওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু করা হয়।
বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির আওতায় খাবার পাচ্ছে। কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো—
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি
ঝরে পড়া কমানো
শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা
শিশুদের পুষ্টি উন্নয়ন
সাপ্তাহিক খাদ্যতালিকা
শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ছয় দিন শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হয়। নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী—
শনিবার, রোববার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার: বানরুটি ও সেদ্ধ ডিম
সোমবার: বানরুটি ও ইউএইচটি দুধ
মঙ্গলবার: ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও কলা
ইউএইচটি (Ultra High Temperature) পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত দুধ প্যাকেট খুলে সরাসরি পান করা যায়।
খাদ্যের আনুমানিক মূল্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় প্রতিটি খাদ্য উপাদানের জন্য আনুমানিক বরাদ্দ ধরা হয়েছে—
ডিম: ১৪ টাকা
কলা: ১০ টাকা
বানরুটি: ২৫ টাকা
ইউএইচটি দুধ: ২৯ টাকা
ফর্টিফায়েড বিস্কুট: ১৯ টাকা
কোথায় হচ্ছে অনিয়ম
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়ভাবে খাদ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এজেন্টের মাধ্যমে কাজ করায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কিছু ক্ষেত্রে সরকারি বরাদ্দের তুলনায় কম দামে নিম্নমানের বানরুটি কেনা হচ্ছে। ডিম অনেক আগে সেদ্ধ করে রাখায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার শিক্ষার্থীদের মাঝে কাঁচা বা পচা কলা বিতরণের ঘটনাও ঘটছে।
প্রতিমন্ত্রীর পাঁচ দফা নির্দেশনা
সভায় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ কর্মসূচির মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
অনুমোদিত নমুনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্যাকেজিং কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে না।
পণ্য সরবরাহকারী চালক ও জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হতে হবে।
কোনো অবস্থাতেই সাবকন্ট্রাক্ট বা উপঠিকাদারি দেওয়া যাবে না।
সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) প্রতি মাসে অন্তত দুবার আকস্মিকভাবে কারখানা পরিদর্শন করবেন।
জবাবদিহি ও মান নিশ্চিতকরণে নতুন পদক্ষেপ
সরকার মনে করছে, অভিভাবক—বিশেষ করে মায়েদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের মান তদারকি আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি বাড়বে এবং অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক গার্ডিয়ান কমিটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠবে।