পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান ঈসা খান। তাঁদের দাবি, দীর্ঘ সাত মাস ধরে তাঁরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। শুধু পরিবারই নয়, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের সঙ্গেও নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের দাবি, ইমরান খান সুস্থ আছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন এবং কারাবিধি ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
ইমরান খানের গ্রেপ্তারের তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তাঁর দুই ছেলে।
‘বাবার বর্তমান অবস্থা আমরা জানি না’
লন্ডনে বসবাসরত কাসিম খান ও সুলাইমান ঈসা খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বাবার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য তাঁরা পাচ্ছেন না।
তাঁদের ভাষ্য, প্রায় সাত মাস ধরে পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও আইনজীবীদের সঙ্গে ইমরান খানের নিয়মিত সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।
দুই ভাইয়ের দাবি, এ কারণে তাঁরা বাবার প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।
মুক্তির দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ
ইমরান খানের গ্রেপ্তারের তৃতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
হাজার হাজার নেতা-কর্মী সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন শহরে কর্মসূচি পালন করেন।
রাজনৈতিক পটভূমি
২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন ইমরান খান। তবে ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারান তিনি।
এর এক বছর পর দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসসহ একাধিক মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান সাবেক এই ক্রিকেট তারকা।
ইমরান খান ও তাঁর দল বরাবরই দাবি করে আসছে, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সরকারের বিরোধিতা করায় তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ধারাবাহিকভাবে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
‘ভিসা নয়, বাস্তবতা ভিন্ন’
২০০৪ সালে ইমরান খান ও তাঁর প্রথম স্ত্রী জেমিমা গোল্ডস্মিথের বিচ্ছেদের পর কাসিম ও সুলাইমান লন্ডনে বসবাস করছেন।
সেখান থেকেই তাঁরা বাবার মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলে আসছেন।
দুই ভাইয়ের অভিযোগ, তাঁরা যখনই প্রকাশ্যে বাবার বিষয়ে কথা বলেন, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাঁদের দেশে গিয়ে দেখা করার পথ আরও কঠিন করে তোলে।
কাসিম খান বলেন,
“আমরা পাকিস্তানে যেতে চাই। কিন্তু নানা প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের ভিসা না দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।”
তবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, কাসিম ও সুলাইমান দুজনের কাছেই ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড ফর ওভারসিজ পাকিস্তানিজ (NICOP) রয়েছে। এই পরিচয়পত্র থাকলে তাঁদের পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য আলাদা ভিসার প্রয়োজন হয় না।
সরকার আরও দাবি করেছে, প্রশাসনিক বিষয়কে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে দুই ভাইয়ের বক্তব্য, তাঁদের ওই পরিচয়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেটি এখনো নবায়ন করা হয়নি। এ বিষয়ে সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।
অ্যামনেস্টির উদ্বেগ
চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে ইমরান খান ও বুশরা বিবির পরিবার, আইনজীবী এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করার ‘নিঃশর্ত অধিকার’ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, তাঁদের পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং বেআইনিভাবে নির্জন কারাবাসে রাখার অভিযোগ থাকলে তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
সরকারের পাল্টা দাবি
সব অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, ইমরান খানকে সাত মাস ধরে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে—এ দাবি ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে পরিবার, আইনজীবী এবং অন্য অনুমোদিত ব্যক্তিদের একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে।
সরকার আরও জানায়, গত ২১ মার্চ ইমরান খান তাঁর ছেলেদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। ফলে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
সরকারের ভাষ্য, একজন উচ্চপ্রোফাইল বন্দীর ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা, কারাবিধি এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।
‘স্বাস্থ্য স্থিতিশীল’
সরকারি বিবৃতিতে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থাকে ‘স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, তাঁর স্বাস্থ্যের কোনো গুরুতর অবনতি হয়নি এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসা এবং ফলোআপ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
‘সাত কক্ষের বিশেষ কম্পাউন্ড’
সরকার ইমরান খানের কারাবাসের পরিবেশ সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।
বিবৃতি অনুযায়ী, তাঁকে একটি সাত কক্ষবিশিষ্ট বিশেষ কম্পাউন্ডে রাখা হয়েছে, যা মূলত ৩০ থেকে ৩৫ জন বন্দীর জন্য নির্মিত হয়েছিল।
সেখানে রয়েছে—
৫৭ ফুট × ১৪ ফুটের একটি করিডর,
৩৫ ফুট × ৩৭ ফুটের একটি লন,
বিছানা, তোশক, বালিশ ও কম্বল,
টেবিল-চেয়ার,
শৌচাগার,
ব্যায়ামের সরঞ্জাম।
সরকারের দাবি, তাঁকে নির্জন কারাবাসে রেখে অমানবিক পরিস্থিতিতে রাখা হচ্ছে—এ ধরনের অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ বহাল
তবে সরকারের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতোমধ্যে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের বহু নেতা-কর্মীকে গণহারে গ্রেপ্তার করার ঘটনাকে ‘স্বেচ্ছাচারী’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কাসিম খানের দাবি, তাঁদের দলের বহু নেতাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়েছে এবং অন্তত ৮৫ জনকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে।
আপসের সম্ভাবনা দেখছেন না ছেলেরা
সরকারের সঙ্গে ইমরান খানের কোনো সমঝোতা বা আপসের সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দুই ভাইই তা নাকচ করেছেন।
সুলাইমান বলেন, তাঁর বাবা নিজের মুক্তির বিনিময়ে অন্য রাজনৈতিক বন্দীদের কারাগারে রেখে কোনো চুক্তি করবেন না।
তাঁর ভাষায়, সব রাজনৈতিক বন্দীর বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইমরান খান কোনো আপসে রাজি হবেন না।
কাসিমও বলেন, আপসের সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।
স্বাস্থ্য প্রতিবেদন চেয়ে ব্যর্থ পরিবার
কাসিম খান অভিযোগ করেন, তাঁদের পরিবার বারবার ইমরান খানের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন দেখতে চাইলেও তা দেওয়া হয়নি।
এ কারণে তাঁদের আশঙ্কা, বাস্তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলেও সেটি গোপন রাখা হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কাসিম খান।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের মধ্যে পাকিস্তানের পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
তাঁর ভাষায়, “শুধু ছেলে হিসেবে নয়, পাকিস্তানের কোটি কোটি মানুষের পক্ষ থেকেও আমরা কথা বলছি। তাঁরা ইমরান খানকে ভোট দিয়েছেন এবং দেশের নেতৃত্বে দেখতে চান। কিন্তু জনগণের সেই রায় উপেক্ষা করে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছে।”
ইমরান খানের স্বাস্থ্য, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে পাকিস্তানে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও, তাঁর পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন এবং সরকারের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।