ঢাকা

হরমুজ নিয়ে ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পক্ষগুলো, সুবিধাজনক অবস্থানে ইরান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
খসড়া সমঝোতায় প্রবেশকারী জাহাজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের কথা, টোল আদায় নিয়েও আলোচনা; যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সংকট এখনো কাটেনি

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কয়েক দফা বৈঠকের পর দুই দেশ একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে এবং চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে শেষ পর্যায়ের আলোচনা চলছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাকি অমীমাংসিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হলে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণা করা হতে পারে।

একাধিক কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান খসড়া সমঝোতা অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সেবা ফি বা টোল আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পেতে পারে ইরান। যদি এ রূপেই চুক্তি কার্যকর হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের প্রভাব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নৌ-পরিবহন চুক্তি নয়; বরং সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

প্রাথমিক সমঝোতার কথা স্বীকার ইরানের

কয়েক দিন ধরে চলা আলোচনার পর বুধবার রাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নিশ্চিত করেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক ঐকমত্যে পৌঁছেছে তেহরান। তিনি জানান, চূড়ান্ত চুক্তির আগে এখনো কিছু বিষয় পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

একই বিষয়ে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজ চলাচলের রুট ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য হবে।

তবে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, খসড়া চুক্তিতে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর তেহরানের কর্তৃত্ব কতটা থাকবে, সেটি এখনো আলোচনায় রয়েছে।

টোল আদায় নিয়ে মতপার্থক্য

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে জাহাজ থেকে আদায়যোগ্য সেবা ফি বা টোল।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান জাহাজে বহন করা পণ্যের মোট মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

অন্যদিকে ওমান এই হার কমিয়ে ৩ শতাংশ নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই যেকোনো ধরনের টোল ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছে। ওয়াশিংটনের মতে, আন্তর্জাতিক নৌপথে অতিরিক্ত ফি আরোপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।

‘চূড়ান্ত ঘোষণা শিগগিরই’

তেহরানে অবস্থানরত আল–জাজিরার সাংবাদিক তোহিদ আসাদি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, এখনো যেসব বিষয় চূড়ান্ত হয়নি, সেগুলো তুলনামূলক ছোটখাটো ইস্যু।

তাঁর ভাষ্য, মূল প্রশ্ন—অর্থাৎ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের কাঠামো—নিয়ে ইতোমধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ফলে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।

দুটি নৌপথের পরিকল্পনা

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক রব জেইস্ট পিনফোল্ড জানিয়েছেন, আলোচনায় থাকা খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে দুটি পৃথক নৌপথ নির্ধারণ করা হতে পারে।

এর একটি থাকবে ইরানের উপকূল ঘেঁষে এবং অন্যটি ওমানের উপকূল দিয়ে।

তবে তাঁর মতে, নতুন রুট যুদ্ধের আগে ব্যবহৃত মূল নৌপথের বিকল্প হতে পারবে না। কারণ নতুন রুট দিয়ে আগের মতো বিপুলসংখ্যক জাহাজ চলাচল সম্ভব নয়। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী সমাধান নয়।

যুদ্ধের পর বদলে যায় পরিস্থিতি

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে তেহরান।

বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে হয়ে থাকে। ফলে পথটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ওয়াশিংটনের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

যুদ্ধের পরও অবস্থান বদলায়নি তেহরান

জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালেও হরমুজ ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি।

ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে দিয়ে কোনো জাহাজ পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতে পারবে না। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের বিনিময়ে টোল আদায়ের দাবিতেও অনড় রয়েছে দেশটি।

ইরানের অভিযোগ, ওমানের উপকূল ঘেঁষে বিকল্প পথ ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করা হলে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে ওই ধরনের চলাচলের বিরুদ্ধেও তারা ব্যবস্থা নিয়েছে।

আলোচনায় নেই যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান ইরান–ওমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছে তেহরান।

অন্যদিকে চুক্তির খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ কিংবা অস্থায়ী রুট ব্যবহার করে টোল আদায়ের কোনো পরিকল্পনাকে তারা সমর্থন করে না।

যুক্তরাষ্ট্রের মতে, আন্তর্জাতিক নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংকট শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এখনো নেই

আল–জাজিরার বিশ্লেষক মাহমুদ আবদেল ওয়াহেদের মতে, ইরান ও ওমানের মধ্যে চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংকটের অবসান হবে না।

তিনি বলেন, টোল আদায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন নৌ অবরোধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় অগ্রগতির অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল।

পাল্টাপাল্টি হুমকিতে উত্তেজনা

চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা কমেনি।

বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ ইস্যুতে সমঝোতা না হলে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

এর জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমির আকরামিনিয়া বলেন, দেশের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকির জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড়

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ বাড়লে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ সংকট পুরোপুরি কাটবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স