জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনার মধ্যেই উপাচার্যের কাছে পৃথক স্মারকলিপি দিয়েছে তিনটি ছাত্রসংগঠন। বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু), বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি পৃথকভাবে উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে তাদের দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি জমা দেয়।
স্মারকলিপিগুলোতে হামলার বিচার, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসন এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
জকসুর ৯ দফা দাবি, প্রক্টরের অপসারণে আলটিমেটাম
বেলা দেড়টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রইছ উদ্দীনের কাছে ৯ দফা দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি জমা দেয় জকসু। উল্লেখ্য, বর্তমান জকসুর অধিকাংশ প্রতিনিধি ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত।
স্মারকলিপিতে জকসুর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বুধবার দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের উন্নয়নের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন।
তাদের দাবি, ওই সময় প্রক্টরিয়াল বডি এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সেখান থেকে বের করে দেন। পরে শিক্ষার্থীরা শহীদ ইকরামুল হক সাজিদ ভবনের সামনে অবস্থান নিলে প্রক্টরের পরোক্ষ নির্দেশে ছাত্রদল ও বহিরাগতদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্রসহ তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার, হামলায় জড়িতদের শাস্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে অপসারণের দাবিতে প্রশাসনকে তিন কার্যদিবসের আলটিমেটাম দিয়েছে জকসু।
ছাত্রদলের পাল্টা অভিযোগ
একই দিন দুপুর ২টার দিকে উপাচার্যের কাছে পৃথক স্মারকলিপি জমা দেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
স্মারকলিপিতে ছাত্রদল দাবি করে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে তারা নিজেদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছিল। তবে জকসুর ব্যানারে ছাত্রশিবির-সমর্থিত কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
ছাত্রদল ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সব ছাত্রসংগঠনের ক্ষেত্রে একই নিয়ম ও নীতিমালা সমানভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানায়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালনেরও দাবি জানায় তারা।
জাতীয় ছাত্রশক্তির পাঁচ দফা দাবি
এরপর বেলা আড়াইটার দিকে উপাচার্যের কাছে পাঁচ দফা দাবি-সংবলিত স্মারকলিপি জমা দেয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করা, আগামী ছয় মাসের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ছাত্রদলের বিক্ষোভ সমাবেশ
এদিকে একই দিন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের নিচে বিক্ষোভ সমাবেশ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, গত ১৭ বছরের ছাত্ররাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখতে ছাত্রদল কাজ করে যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কেউ যদি মব সৃষ্টি করে বা জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।
ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার কার্যক্রমে সহায়তা করার আহ্বান জানান।
উত্তেজনার মধ্যে প্রশাসনের দিকে নজর
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং পৃথক দাবি সামনে এসেছে। একদিকে জকসু প্রশাসনের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে প্রক্টরের অপসারণ দাবি করেছে, অন্যদিকে ছাত্রদল অভিযোগ করেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অমান্য করে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় ছাত্রশক্তি নিরাপত্তা, আবাসন ও দ্বিতীয় ক্যাম্পাস বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
এ পরিস্থিতিতে সংঘর্ষের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।