ঢাকা

ভারতের সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: শেখ হাসিনাকে সুযোগ কেন

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কেন দিল—এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রশ্ন রয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিতে এটি শুধু একজন আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির বক্তব্য দেওয়ার বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশকে ঘিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। বক্তব্যের পর তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

এ ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার রাতেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ক্ষুব্ধ। বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

‘আশ্রয় দেওয়া আর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া এক নয়’

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো দেশ রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে, তবে আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিকে অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া ভিন্ন বিষয়।

তিনি বলেন, “ভারত তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁকে সরাসরি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তিকে ভারত সরকার কেন এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিল—এটাই আমাদের প্রশ্ন।”

‘অনুশোচনা নয়, রাজনৈতিক তৎপরতা’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোর জন্য আওয়ামী লীগ এখনো কোনো ধরনের দুঃখ প্রকাশ বা অনুশোচনা করেনি।

তাঁর ভাষ্য, “জুলাই আন্দোলনের সময় তারা গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত তারা না দুঃখ প্রকাশ করেছে, না ক্ষমা চেয়েছে। বরং ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে।”

আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবির জবাব

নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দলগতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন প্রক্রিয়ার অংশ।

তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই হবে।

‘নিষেধাজ্ঞা আদালতের বিষয়’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়নি। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে, সরকার সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”

‘জনগণও বিচার করবে’

সাক্ষাৎকারে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বিচার শুধু আদালতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনৈতিকভাবে জনগণও তাদের মূল্যায়ন করবে।

তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের মানুষের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, গুম, হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তাঁর মতে, এসব ঘটনার কারণে জনগণের একটি বড় অংশ দলটির প্রতি আস্থা হারিয়েছে।

তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনে তারা গণহত্যা চালিয়েছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে বিরোধী মত দমন করেছে, গুম ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই জনগণের মধ্যেও তাদের কর্মকাণ্ডের বিচার হবে।”

কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন আলোচনা

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং তা ঘিরে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দুই দেশের সম্পর্কের সংবেদনশীল একটি ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলায় বিষয়টি এখন কূটনৈতিক আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং শেখ হাসিনার বিদেশে অবস্থান—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স