পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি–এর আকস্মিক ঝালমুড়ি খাওয়ার ঘটনা। ঝাড়গ্রাম সফরে রাস্তার পাশের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে তাঁর ঝালমুড়ি খাওয়ার এই মুহূর্ত ইতোমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রোববার পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল অঞ্চলের চার জেলায় নির্বাচনী জনসভা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় একাধিক সমাবেশ শেষে ঝাড়গ্রাম থেকে পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পথে হঠাৎই তিনি গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন।
ঝাড়গ্রাম শহরের কলেজ মোড়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঢুকে পড়েন স্থানীয় একটি ঝালমুড়ির দোকানে, যার মালিক বিক্রম কুমার সাউ। দোকানদার বিহারের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে ঝাড়গ্রামে স্থায়ীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দোকানে ঢুকেই প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দোকানদার তাৎক্ষণিকভাবে মাত্র ১০ টাকার ঝালমুড়ি প্রস্তুত করে তাঁকে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দোকানদারের সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও খোঁজখবর নেন।
দোকানদার জানান, ঝালমুড়ি তৈরির সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি পেঁয়াজ খান কি না, জবাবে ইতিবাচক উত্তর পান। ঝালমুড়ি খাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দোকানদারকে ১০ টাকার একটি নোট দিতে চাইলে প্রথমে তিনি তা গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, পরে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে তাঁর হাতে তা তুলে দেন।
ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
মমতার তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একে ‘নির্বাচনী নাটক’ বলে অভিহিত করেন।
সোমবার বীরভূমের মুরারই–তে এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেন, নির্বাচনের সময় এমন ঘটনা সাজানো হয় এবং সাধারণ মানুষের সামনে একটি ভিন্ন চিত্র উপস্থাপন করা হয়। তাঁর অভিযোগ, এটি পূর্বপরিকল্পিত প্রচারণার অংশ।
মমতা আরও প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এমন একটি ঘটনায় ক্যামেরা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল এবং পুরো ঘটনাটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে কি না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে বলেন, নির্বাচনের সময় নানা ধরনের ‘নাটকীয়তা’ তৈরি করা হয়।
ঝালমুড়ি দোকানির বক্তব্য
অন্যদিকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার বিক্রম কুমার সাউ জানান, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে জানায় যে প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খেতে পারেন। এর কয়েক মিনিট পরই প্রধানমন্ত্রী নিজে দোকানে আসেন এবং ঝালমুড়ি খাওয়ার অর্ডার দেন।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতিতে তিনি বিস্মিত হয়ে পড়েন এবং দ্রুত ঝালমুড়ি তৈরি করেন। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত দ্রুত ঘটে যাওয়ায় তিনি তখন পরিস্থিতি সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন বলেও জানান।
রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থান
মমতার মন্তব্যের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও অতীতে বিভিন্ন সময় সাধারণ দোকানে গিয়ে খাবার প্রস্তুত করেছেন, যা কখনো নাটক হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি।
বিজেপির দাবি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়, এবং এটিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ধরনের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। একদিকে জনসংযোগমূলক কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে তার ব্যাখ্যা ও পাল্টা ব্যাখ্যা—সব মিলিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
ঝালমুড়ির এই এক সাধারণ মুহূর্ত এখন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা নির্বাচনী প্রচারণার ভাষ্য ও কৌশল নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।