পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। শেষ দিনের প্রচারে এসে একদিকে যেমন বিজেপি শিবির আক্রমণাত্মক বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে পাল্টা জবাব দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত মন্তব্য।
বাবরি মসজিদ ইস্যুতে কড়া অবস্থান অমিত শাহর
ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে আম জনতা পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর–এর প্রস্তাবিত বাবরি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে একাধিক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।
অমিত শাহ বলেন, এই ধরনের প্রস্তাব রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাজ্যে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস–এর সময় “দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা” বেড়েছে এবং জনগণ পরিবর্তন চায়।
প্রচারে বিজেপির আক্রমণাত্মক বার্তা
প্রচারের শেষ দিনে কার্শিয়াংয়ের সুকনা, বর্ধমানের কুলটি এবং মেদিনীপুরের শালবনীতে জনসভা করেন অমিত শাহ। এসব সভায় তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের সময় শেষ হয়ে এসেছে এবং রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তন অনিবার্য।
তিনি আরও দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে দার্জিলিং অঞ্চলের গোর্খা সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করা হবে। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নাগরিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাসও দেন তিনি।
নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর বার্তা দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, ভোটের দিন কোনো ধরনের অশান্তি বা সহিংসতা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তৃণমূলের পাল্টা আক্রমণ
অন্যদিকে, একই দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক নির্বাচনী সভায় বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেন। হলদিয়া, ব্যারাকপুর, জগদ্দল ও জোড়াসাঁকোয় অনুষ্ঠিত সভাগুলোতে তিনি বিজেপিকে “দুর্নীতি ও বিভাজনের রাজনীতি” করার অভিযোগ করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার জন্য পর্যাপ্ত উন্নয়ন বরাদ্দ করছে না এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভাজনের রাজনীতি চালাচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।
তৃণমূল নেত্রী বলেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে আছি এবং থাকব। বাংলাকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুক্ত রাখতে হবে।”
অন্যান্য রাজনৈতিক তৎপরতা
প্রচারের শেষ দিনে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে একাধিক রাজনৈতিক নেতা সভা ও রোড শো করেন। এর মধ্যে ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা, বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এবং বিভিন্ন দলের আরও কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
বিপরীতে বিরোধী শিবির থেকেও কংগ্রেস ও অন্যান্য দল নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ছিল, যা ভোটের আগে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র—দিঘা, মন্দারমণি, তাজপুরসহ একাধিক এলাকায় বহিরাগত প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে হোটেলগুলোতে বাইরের জেলার লোকজনের অবস্থান নিয়েও কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে দার্জিলিং, কোচবিহার, মালদহ, মুর্শিদাবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলো রয়েছে।
রাজনৈতিক উত্তাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে
প্রথম দফার ভোটের ঠিক আগে শেষ দিনের প্রচারে এসে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কার্যত চূড়ান্ত উত্তাপের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ধর্মীয় ইস্যু, উন্নয়ন, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে ভোটের আগে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক লড়াই এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।